জাপানে মৃতদেহ নিয়ে ব্যবসা


জাপানে দিন দিন মৃত্যুহার বাড়ার সঙ্গে জমজমাট হয়ে ওঠেছে মৃত ব্যাক্তির সৎকার ব্যবসা। দেশটিতে জন্মহারের তুলনায় মৃত্যুহার তুলনামূলক বেশি। এর সুযোগ নিচ্ছে জাপানের এমন কিছু কোম্পানি যারা মৃত্যুর পর মৃত ব্যাক্তির সৎকারের সব দায়িত্ব নিয়ে থাকে। কিন্তু এখানেই তাদের ব্যবসার শেষ নয়। তারা মৃত ব্যাক্তির কফিনগুলো এভাবে প্রস্তুত করে যার ভেতর লাশ সহজেই বিস্ফোরিত হয়। সেই বিস্ফোরিত লাশের ছাইগুলো পরবর্তীতে তারা হীরাতে পরিণত করে। আর এতে করে শুধু ব্যবসায়িরাই লাভবান হচ্ছে না বরংচ মৃত ব্যাক্তির পরিবারের সদস্যরাও লাভবান হচ্ছে।
কফিন বিক্রয় কোম্পানির একজন প্রতিনিধি কোয়চি ফুজিতার মতে ‘আমরা আমাদের সৎকারের ব্যবহার করা পণ্যগুলো সারাদেশ জুড়ে প্রচার করতে চাই কারণ জাপানে প্রতিবছর ১ দশমিক ২ মিলিয়ন মানুষ মারা যায়, আর আমাদের পণ্য বিক্রির সংখ্যা মাত্র ষাট হাজার’। সে সম্প্রতি একটি পরিসংখ্যান তুলে বলেন, জাপানে প্রতি বছর আমরা বিদায় জানাই ১ দশমিক ৩ মিলিয়ন মানুষকে, আর সদ্য জন্ম নেয়া শিশুর সংখ্যা মাত্র এক মিলিয়ন। ফুজিতা সেই কোম্পানিগুলোর একটি যারা প্রতি বছর টোকিওতে হওয়া প্রদর্শনীতে নিজেদের পণ্য উপস্থাপন করে থাকে। শুধু কফিনে ব্যবহারের জন্য নয় জীবিত অবস্থায়ও অনেকে তাতামি নামে জাপানে তৈরি এই মাদুড়টি ব্যবহার করে থাকে। বেশ চড়া দামে বিক্রি হয় এই মাদুড়টি। আর এই মাদুর জাপানের অধিকাংশ ঘরের মেঝেতে ব্যবহার করা হয়। কফিনের ওপর তাতামি মাদুড় এই কারণে দেয়া হয় যেন মরার পর মৃত ব্যাক্তি যাতে বুঝতে পারে তারা তাদের ঘরেই মারা গেছে। 
জাপান পৃথিবীর এমন একটি দেশ যেখানে মানুষের বার্ধক্য খুব দ্রুত আসে। আর বার্ধ্যকের এই সংখ্যা হচ্ছে মোট জনসংখ্যার এক চতুর্থাংশ। আর তাদের সবার বয়স ৬৫ বা তার চেয়েও বেশি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে আশঙ্কা করা হয় ২০৬০ সালে এই সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে মোট জনসংখ্যার ৪০ শতাংশ হবে। বিভিন্ন কারণে জাপানের নাগরিকরা কম সময়ে বার্ধক্যের দিকে ঝুঁকে পড়ছে আর তার কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে একটু বয়স হলেই নানরকম ঔষধ সেবন। যেহেতু দেশটিতে বয়স্কের সংখ্যা বেশি তাই জাপানের ব্যাংক ও পোষ্ট অফিসগুলোতে যাদের চোখের সমস্যা আছে তাদের জন্য রিডিং গ্লাসের ব্যবস্থা রাখা হয়। যেহেতু জাপান ব্যাপক বার্ধ্যকের দেশ তাই এখানে বৃদ্ধদের জন্য সবরকম বৈদ্যুতিক জিনিসপত্র ব্যবহারে আছে বিশেষ ব্যবস্থা। আর নামকরা একটি কোম্পানি প্যানাসনিক বয়স্কদের কথা মাথায় রেখে তৈরি করেছে এই বিশেষ বৈদ্যুতিক যন্ত্রগুলো। যার মধ্যে রয়েছে ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওয়েভ, রাইসকুকারসহ আরও অনেক পণ্য।
জাপানে মৃত্যুর পরের অনুষ্ঠানটিকে বলে সুকাত্সু। আর এই অনুষ্ঠানটি সঠিকভাবে সম্পন্ন করার জন্য রয়েছে বেশ অনেকগুলো কোম্পানি। আর এতে কাজের সুযোগ মিলছে অনেকের। দাই-চি লাইফ রিসার্চ ইনস্টিটিউটের একজন সমাজবিজ্ঞানী মিদোরি কোতানির মতে, পরিসংখ্যান বলছে ২০৩৮ সালের মধ্যে ১ দশমিক ৬৮ মিলিয়ন মানুষ মারা যাওয়ার সম্ভবনা রয়েছে। আর যতই মানুষ মারা যাবে ততই ব্যবসায়িদের কাজের সুযোগ বাড়বে। জাপানের অধিকাংশ মানুষ বৌদ্ধ ধর্মালম্বী হওয়ায় প্রথা অনুযায়ী তাদের কফিনের সঙ্গে বেশকিছু জিনিসপত্র দিতে হয়। আর এই দিনে খুচরা কফি বিক্রেতাদের হয় জমজমাট ব্যবসা। কারণ যারা মৃত ব্যাক্তির সৎকার অনুষ্ঠানে আসে তাদের প্রত্যেকে উপহার হিসেবে কফি দেয়া হয়।
মৃত ব্যাক্তিদের দেহাবশেষ থেকে যে হীরা তৈরি করা হয় তা আবার বিভিন্ন অলংকারের দোকানে বেশ চড়া দামে বিক্রি করা হয়। আর এখন হীরায় আকৃষ্ট হয়ে অবস্থা এমন দাড়িয়েছে যে, অনেকে আবার সৎকারের আয়োজন না করেই লাশ পোড়ানোর জন্য পাঠিয়ে দেয়। আর এভাবেই পুরো জাপান জুড়ে বেশ জমজমাট কায়দায় বেড়েই চলেছে মৃতব্যাক্তির দেহ নিয়ে লোভনীয় এই ব্যবসা।