জাপানের ডেটিং ‘শিল্প’

 

বর্তমান আধুনিক বিশ্বে শিশু নির্যাতন একটি বহুল আলোচিত বিষয়। দেশে দেশে এই নির্যাতন নিয়ে বহু আলোচনা হলেও এখনও থামছে না এই নির্যাতন। পশ্চিমের বিভিন্ন বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থা শিশু নির্যাতনের জন্য এতদিন শুধু আফ্রিকা এবং এশিয়াকে দোষারোপ করলেও, একবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে বেশকিছু পরিসংখ্যান বের হলে জানা যায়, ইউরোপ-আমেরিকাতেও এই নির্যাতনের হার আশঙ্কাজনক। গবেষকরা দীর্ঘদিন ধরেই শিশু নির্যাতনের বিভিন্ন দিক নিয়ে গবেষণা করছেন। কিন্তু আধুনিক পুঁজিবাদের কারণে যে নতুন আরেক ধরনের শিশু নির্যাতন বাড়ছে তার খবর এখনও পুরোপুরি অজানা। যেমন ধরা যাক এশিয়ার দেশ জাপানের কথাই। দেশটিতে শিশু নির্যাতনের হার আশঙ্কাজনক। আর এই নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে খোদ বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ও পুঁজিবাদী ব্যবস্থার হাত ধরে। সম্প্রতি জাতিসংঘ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে যে, শিশু নির্যাতন বন্ধে জাপানের আরও উদ্যোগী হওয়া উচিত। বিশেষত দেশটির বিভিন্ন বিনোদনমূলক ক্যাফেতে যে তরুণীরা কাজ করছে তাদের প্রতি শোষণ বন্ধে এগিয়ে আসা উচিত বলে মনে করছে জাতিসংঘ।
গত অক্টোবরে জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক বিশেষ দূত বোর বুকিনচিহো শিশু নির্যাতন এবং পর্নোগ্রাফি নিয়ে জাপানের ভূমিকার সমালোচনা করেন। পাশাপাশি তিনি এই পরিসংখ্যানও সরবরাহ করেন যে, দেশটির ১৩ শতাংশ স্কুলগামী ছাত্রী বিভিন্ন ক্ষেত্রে অর্থ উপার্জনের জন্য প্রেমময় যৌনতাকে(অর্থের বিনিময়ে) বেছে নেয়। যদিও এই পরিসংখ্যান প্রকাশ করার সময় তিনি এও বলেন যে, এই রিপোর্টটি এখনও আনুষ্ঠানিক নয় কিন্তু স্থানীয় সামাজিক উন্নয়নকর্মীদের মতে, বুকিনচিহোর পরিসংখ্যানের চেয়ে বাস্তবিক অবস্থা আরও বেশি খারাপ।
জাপানের রাজধানী টোকিও শিশুদের এই যৌন সংস্কৃতিকে গ্রহন করে নিয়েছে এবং জাপানি মানবাধিকার দলগুলো এই চর্চা বন্ধে বিভিন্ন সভা সেমিনারও করছে। কিন্তু বৃহত পুঁজি ও সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ের কারণে জাপান থেকে এই সংস্কৃতি দূর করা যাচ্ছে না। অধিকাংশ জাপানিই মনে করেন, উন্নত বিশ্বের সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা এবং দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক অবরোধের কারণে আভ্যন্তরীন অর্থনৈতিক অবস্থার বিপর্যয়ের কারণে অধিকাংশ মেয়ে শিশুই বাধ্য হয়ে এই কাজে নামে। উপরন্তু রয়েছে উন্নত প্রযুক্তির চাহিদা, যে কারণে অনেক সময় একটি ভালো মোবাইল ফোন কেনার জন্যও এই কাজে নামতে দেখা যায় অনেক জাপানি তরুণীকে।
টোকিওর আখিয়াবারা জেলার বাসিন্দা মাই একটি হাই স্কুল গার্ল ক্যাফেতে কাজ করেন। এই ক্যাফেতে প্রাপ্তবয়স্করা অর্থের বিনিময়ে বসেন এবং তরুণীদের সঙ্গে আড্ডা দেন। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আলজাজিরাকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে মাই বলেন, ‘তাদের মধ্যে অনেকেই আছেন যারা আমার দাদার বয়সী এবং আমাকে প্রায়শই তাদের সঙ্গে সময় কাটাতে হয়। মূলত তাদের সুন্দর নারী দরকার। এটাই তাদের একমাত্র চাহিদা। তাদের উচিত রোগা গড়নযুক্ত এবং স্টাইলিশ নারী খুঁজে বের করা। পাশাপাশি তাদের উচিত আরও সুদর্শনা কাউকে পছন্দ করা।’
মাই যে ক্যাফেতে কাজ করেন সেই ক্যাফের মালিক কইচিরো ফুকুয়ামা সাধারণত তার ক্যাফেতে ১৫ থেকে ১৮ বছর বয়সী মেয়েদেরই কাজে নেন। যদিও ফুকুয়ামা দাবি করেছেন যে, তার ক্যাফেতে যৌনকর্মীদের কোনো স্থান নেই। কিন্তু অন্যান্য অনেক মানবাধিকার সংস্থার মতে, এধরণের ক্যাফেগুলো সরাসরি যৌনপেশার সঙ্গে সংযুক্ত না থাকলেও, খদ্দেরকে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বাইরে যৌন সেবা দেয়ার রীতি প্রচলিত আছে। তাই দৃশ্যত এই ক্যাফেগুলোতে এই কাজ না হলেও এর রয়েছে পরোক্ষ অবস্থান।
সবচেয়ে আশ্চর্যজনক কথা হলো, শিশু নির্যাতন নিয়ে বহু বছর ধরে আলোচনা চললেও মাত্র ২০১৪ সালে এই নির্যাতন বিরোধী আইন পাশ হয় জাপানে। আইন প্রনয়ন পূর্ববর্তীতে দেশটির কার্টুনগুলো দেখলে সহজেই অনুমান করা যায় শিশুদের প্রতি জাপানিদের আচরণের বৈসাদৃশ্যতা। অবশ্য ২০১৫ সালের শুরুতে জাপান অপর একটি আইন করেছে শিশু নির্যাতন বন্ধে, আর সেটা হলো কোনো ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান কর্মী হিসেবে শিশুদের নিয়োগ দিতে পারবে না। যদি কেউ এই আইন অমান্য করে তবে তার ব্যবসার নিবন্ধন বাতিল করে দেয়া হবে। যদিও এই আইনের ফাঁক গলেই এখনও ক্যাফেগুলোতে অপ্রাপ্তবয়সী মেয়েদের নিয়োগ দেয়া হচ্ছে।