পুরাণ ঢাকার যত জনপ্রিয় খাবার এবং তাদের প্রাপ্তি স্থান !

 
ফিচার, অবন্তী জামান তন্বীঃ  ঢাকার খাবারদাবারের ঐতিহ্য আর ইতিহাস বহু পুরনো। এখনও সেই খাবারের ঐতিহ্য ধরে রেখেছে পুরনো ঢাকা। সেখান থেকে ঘুরে এসে মজাদার খাবার নিয়ে লিখেছেন তৌহিদুল ইসলাম তুষার। ছবি তুলেছেন সৈয়দ অয়ন
ইতিহাস আর ঐতিহ্যের এক জীবন্ত সাক্ষী পুরান ঢাকা। প্যারিসের পারি আর বাংলার পুরান ঢাকার মধ্যে রয়েছে বেশ সখ্য। পারি যেমন একদিকে পুরনো ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছে, অন্যদিকে রসনা বিলাসে পরিপূর্ণ শহরটি। তার রাস্তার দু’ধারেই গড়ে উঠেছে সারি সারি খাবারের দোকান। এর সুবাস পাওয়া যায় এক কিলোমিটারেরও বেশি দূর থেকে। সন্ধ্যা নামলেই চালু হয় দোকানগুলো। সন্ধ্যা ৭টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত চলে এসব রেস্তোরাঁ। এ যেন এক রাতের নগরী। পুরো নগরী হয়ে ওঠে কর্মচঞ্চল। ঠিক একই রকম সুখ্যাতি আছে পুরান ঢাকার। পুরান ঢাকা মানেই জিভে জল এসে যাওয়ার মতো সব খাবার-দাবার। পূর্ণ স্বাদের এমন তৃপ্তি খুঁজে পাওয়া ভার। খাবারের এ সমারোহে কোনোটিই যেন কম নয় কোনোটি থেকে।

ঐতিহাসিকেরা বলছেন, ৪০০ বছর আগে ঢাকা যখন প্রাদেশিক রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি পায়, তারও আগে ঢাকায় জনবসতি ছিল। তাদের খাদ্যতালিকা, রন্ধনপ্রণালি ছিল এক রকম। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ঢাকার আদি খাবারে অন্য সব সংস্কৃতির প্রভাব পড়ে। বহু বিবর্তনের পর খাবারে পরিবর্তন, পরিবর্ধন, সংযোজন-বিয়োজনে নতুন ধারার খাবারদাবার আত্মপ্রকাশ করে। ঢাকাই খাবার বলে যে খাবারটা প্রচলিত, সেটা মূলত মোগলাই খাবার। তবে এর রকমভেদ আছে। পারস্যের খাদ্যরীতির সঙ্গে ঢাকার খাদ্যরীতির মিশেল ঘটেছে। রান্নার ঢঙে পরিবর্তন এসেছে। পারস্যের রান্নায় যে মসলা ব্যবহূত হয়, তার পরিবর্তে দেশীয় মসলা যুক্ত হয়েছে। কালক্রমে তৈরি হয়েছে নতুন এক ধারার খাবার। এটাই ঢাকাই খাবার।

ঢাকার জনপ্রিয় কিছু খাবার ও প্রাপ্তি স্থান:

কাচ্চি বিরিয়ানি
কাজী আলাউদ্দিন রোড, নাজিমুদ্দিন রোড, উর্দু রোড, বংশাল, সিদ্দিক বাজার, চকবাজার, নবাবপুর, ইসলামপুর, ওয়ারী, মালিটোলা ও মৌলভীবাজার এলাকায় কাচ্চি বিরিয়ানির দোকান আছে। মান ও স্বাদের জন্য বিখ্যাত কাজী আলাউদ্দিন রোডের হাজির বিরিয়ানি, হানিফ বিরিয়ানি। মৌলভীবাজার রোডের নান্না বিরিয়ানি, কলকাতা বিরিয়ানি, উর্দু রোডের রয়েল বিরিয়ানি, নারিন্দায় ঝুনার কাচ্চি বিরিয়ানি, মালিটোলার ভুলু বিরিয়ানি, নবাবপুর স্টার হোটেলের কাচ্চি বিরিয়ানি, সুরিটোলার রহিম বিরিয়ানি এবং নাজিমুদ্দিন রোডের মামুন বিরিয়ানির সুনাম আছে।

তেহারি
রয়েল রেস্টুরেন্ট, হাজির বিরিয়ানি, নান্না মিয়ার বিরিয়ানি, ফকরুদ্দিন বিরিয়ানি, হানিফ বিরিয়ানি, তৃপ্তি বিরিয়ানি ও তেহারি ঘরে ভালো তেহারি পাওয়া যায়।

শাহী মোরগ পোলাও
লালবাগ চৌরাস্তা, নাজিমুদ্দিন রোড ও নান্না মিয়ার বিরিয়ানির দোকানে ভালো শাহী মোরগ পোলাও পাওয়া যায়।

লাবাং
পুরান ঢাকার লালবাগ, চকবাজার, নাজিমুদ্দিন রোডে ভালো লাবাং পাওয়া যায়। এ ছাড়া লালবাগের রয়েল হোটেলে এবং বিরিয়ানি ও কাবাবের দোকানে লাবাং পাওয়া যায়।

বাখরখানি
জিঞ্জিরার বরিশুর, ঢাকার লালবাগ, নাজিমুদ্দিন রোড, চানখাঁরপুল, জিন্দাবাহার, কসাইটুলি, নাজিরাবাজার, নবাববাড়ি, আওলাদ হোসেন লেন, নবরায় লেন ও সূত্রাপুরে বাখরখানির দোকান ও কারখানা আছে।

সুতি কাবাব
চকবাজার, লালবাগ, নবাবপুর, জনসন রোড এলাকায় সুতি কাবাব পাওয়া যায়।

বিউটি লাচ্ছি
রায়সাহেব বাজার ও জনসন রোড।

মাঠা
শাঁখারিবাজার পুলিশ ফাঁড়ির সামনে ছাড়াও ইসলামপুর, লক্ষ্মীবাজার, একরামপুর, নবাবপুর, চকবাজার, লালবাগ উর্দু রোড, আমলিগোলা, ওয়ারী, কায়েতটুলি, নাজিরাবাজার, নারিন্দা, চানখাঁরপুলে মাঠা পাওয়া যায়।

জাফরান মিষ্টি
মদিনা মিষ্টান্ন ভাণ্ডার, লালবাগ রোড।

নবাববাড়ির সাঁচি পান
নবাববাড়ি গেট, ইসলামপুর

পুরি
কসাইটুলি, নাজিমুদ্দিন রোড, লালবাগ শিকসাবাজার, জিন্দাবাহার, বাদামতলী কায়েতটুলি, পাকিস্তান মাঠ, নবাবপুর, বকশিবাজারে খাতা পুরি পাওয়া যায়। পুরান ঢাকার ফুটপাতের ছোট ও মাঝারি হোটেলগুলোতে আলুপুরি, ডালপুরি ও কিমা পুরি পাওয়া যায়।

দই-চিঁড়া
মানিক সুইটমিট, জনসন রোড।

• হোটেল আল-রাজ্জাকের কাচ্চি, গ্লাসি, মোরগ পোলাও।
• লালবাগ রয়্যালের কাচ্চি, জাফরান-বাদামের শরবত, চিকেন টিক্কা আর সেরা লাবান, কাশ্মীরী নান।
• নবাবপুর রোডে হোটেল স্টার এর খাসির লেকুশ, চিংড়ি ,ফালুদা।
• নবাবপুর আরজু হোটেল এর মোরগ পোলাও, নাশতা আর কাচ্চি।
• নারিন্দার ঝুনু বিরিয়ানি।
• নাজিরা বাজারের হাজীর বিরিয়ানি।
• নাজিমুদ্দিন রোডের হোটেল নিরবের অনেক ধরনের ভর্তা।
• নাজিরা বাজারের হাজি বিরিয়ানি এর উল্টা দিকের হানিফের বিরিয়ানি।
• বংশালের শমসের আলীর ভূনা খিচুড়ি, কাটারী পোলাও।
• নাজিরা বাজার মোড়ে বিসমিল্লার বটি কাবাব আর গুরদার।
• বেচারাম দেউরীতে অবস্থিত নান্না বিরিয়ানি এর মোরগ-পোলাও।
• ঠাটারীবাজার স্টার এর কাচ্চি বিরিয়ানি, লেগ রোস্ট আর ফালুদা।
• ঠাটারী বাজারের গ্রিন সুইটস এর আমিত্তি, জিলাপি।
• রায় সাহেব বাজারের গলিতে মাখন মিয়ার পোলাও।
• সুত্রাপুর বাজারের রহিম মিয়ার খাসির বিরিয়ানি।
• গেন্ডারিয়ার রহমানিয়া এর কাবাব।
• কলতাবাজারের নাসির হোটেলের বিখ্যাত গরুর মাংস আর পরাটা।
• ভিক্টোরিয়া পার্কের সুলতান ভাইয়ের চা ১।
• দয়াগঞ্জের সিটি বিরিয়ানি ও কাচ্চি।
• নারিন্দার সফর বিরিয়ানি।
• আরমানিটোলা তারা মসজিদের পাশে জুম্মন মামার চটপটি।
• সিদ্দিক বাজারের মাজাহার সুইটস।
• সুত্রাপুর ডালপট্টির বুদ্ধুর পুরি।
• আবুল হাসনাত রোড এর কলকাতা কাচ্চি ঘর।
• রায় সাহেব বাজারের বিউটি লাচ্ছি আর চকবাজারের নুরানী শরবত।
• গেন্ডারিয়ার সোনা মিয়ার দই।
• লালবাগ মোড় এর মীরা মিয়ার চিকেন ফ্রাই আর গরুর শিক।
• লালবাগ চৌরাস্তার খেতাপুরি।
• মতিঝিল শাপলা চত্বর হিরাঝিলের চা।
• নাজিরা বাজারের ডালরুটি।
• গেন্ডারিয়া ভাটিখানার হাসেম বাঙ্গালির ডালপুরি।
• রায়সাহেব বাজারের আল ইসলামের মোরগ পোলাও, চিকেন টিক্কা।
• বাংলাবাজারের বিখ্যাত কাফে কর্নার এর কাকলেট ও চপ।
• বাংলাবাজারের বিখ্যাত চৌরঙ্গী হোটেলের পরাটা, ডাল।
• রায়সাহেব বাজারে কাফে ইউসুফের নান ও চিকেন টিক্কা।
• নবাব পুরের মরণ চাঁদ মিষ্টির দোকানের ভাজি-পরোটা, মিষ্টি ও টক দই।
• লক্ষীবাজার এর মাসহুর সুইটমিট এর লুচি, ভাজি আর ডাল।
• লালবাগের পাক-পাঞ্জাতন এর মজার তেহারি।
• দয়াগঞ্জ এর ঢাকা কাবাব।
• ওয়াইজ ঘাটের নানা রেঁস্তোরা।
• শাখারী বাজারের অমূল্য সুইটস এর পরোটা-ভাজি।
• তাতিবাজারের কাশ্মীর এর কাচ্চি।
• নারিন্দায় সৌরভ এর মাঠা আর ছানা।
• আবুল হাসনাত রোডের কলকাতা কাচ্চি ঘর।
• আবুল হাসনাত রোডের দয়াল সুইটস এর মিষ্টি।
• নারিন্দায় অবস্থিত রাসেল হোটেলের নাশতা।
• ঠাটারী বাজারের বটতলার কাবাব।
• টিপু সুলতান রোডে অবস্থিত হোটেল খান এর টাকি মাছের পুরি।
• লক্ষীবাজার পাতলাখান লেনের লুচি-ভাজি।
• বেচারাম দেউড়িতে হাজী ইমাম এর বিরিয়ানি।

বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে ঢাকাবাসীর কাছে প্রিয় ঢাকাই খাবার। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বহির্বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে ঢাকাই খাবারের সুখ্যাতি। এখনো রোজার মাসজুড়ে পুরান ঢাকার চকবাজারে চলে ঢাকাই খাবারের বেচাকেনা। চকবাজার ও এর আশপাশের এলাকা বাহারি খাবারের সুবাসে এখন ম-ম করছে। কয়েক শ বছরের পুরনো চকবাজারে এখনো বিরিয়ানি, মুরগি মোসাল্লাম, বিভিন্ন জাতের কাবাবের পাশাপাশি শরবত বিক্রি হয়।