কেন বিলুপ্ত হলো প্রাচীন মায়া সভ্যতা?


১৫১৭ সালে স্প্যানিশ দিকবিজয়ীরা ঔপনিবেশিকরা প্রথমবারের মত সাগর পথে যাত্রা শুরু করে মধ্য আমেরিকার দিকে। তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল মায়া সভ্যতার সমাপ্তি ঘটানো। তারা ঠিক সেইভাবেই প্রস্তুতি নিয়ে ছিল। কিন্তু জায়গামত পৌঁছে তারা আবিষ্কার করলো, তাদের বেশিরভাগ কাজই অন্য কেউ একজন করে রেখেছে। মায়া সভ্যতা তখন প্রায় বিলুপ্ত.........    
মায়া সভ্যতার বেশিরভাগ অত্যুচ্চ শহরই চুনাপাথরের স্থাপনা দিয়ে তৈরি। এগুলো পৃথিবীর প্রাচীনতম আধুনিক সভ্যতাগুলোর একটি অতুলনীয় বৈশিষ্ট্য ও নিদর্শন। স্প্যানিশরা দেখলো, যে জঙ্গলের ভেতরে এক সময় গড়ে উঠেছিল এই সভ্যতা, সেই জঙ্গলই আবার গ্রাস করে ফেলেছে একে। 
খুব সাধারণভাবে হিসেব করলে মায়া সভ্যতার ব্যপ্তিকাল ছিল যীশুখ্রিস্টের জন্মের ৬০০ বছর আগে থেকে শুরু করে ১৫৪৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। এটা মোটেও কম সময় নয়। এই দীর্ঘ সময়ে তাদের যে অগ্রগতি সেটা এতোই চমকপ্রদ যে ভাবতে গেলে রহস্যময় লাগে। এতো উন্নত সভ্যতা কেন এই রকম নিরবে হারিয়ে যাবে পৃথিবী থেকে?  
প্রশ্ন হচ্ছে, দীর্ঘকাল টিকে থাকা ইতিহাসের অত্যন্ত রহস্যময় এই সভ্যতার সমাপ্তি কি করে হলো? তাদের সভ্যতা হারিয়ে গেলেও মায়ার মানুষ কিন্তু টিকে ছিল। তারা এমনকি ইউরোপীয়দের শাসনকেও দীর্ঘকাল পর্যন্ত বাধা দিতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু স্প্যানিশরা যখন মায়ার মাটিতে পা রাখলো তখন সমাপ্তি ঘটলো মায়ার বহুল আলোচিত পিরামিড সভ্যতার, একসময় যে পিরামিডের উত্থান ঘটেছিল ২০ লাখ মানুষের প্রাণ-প্রাচুর্য, প্রতিপত্তি এবং বুদ্ধিমত্তায়। 
মায়া সভ্যতার প্রথম নিদর্শন গড়ে উঠেছিল খ্রিস্টপূর্ব এক হাজার বছর আগের কোনো এক সময়ে এবং তারা সভ্যতার শিখরে আরোহণ করেছিল ৬০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে। মেসোআমেরিকার (মধ্য আমেরিকা) কালপঞ্জি অনুসারে, মায়াদের বসত ছিল প্রাচীন ওলমেক এবং পরবর্তী অ্যাজটেক সভ্যতার মাঝামাঝি। প্রত্নতত্ত্ববিদরা মায়া সভ্যতার যে হাজার হাজার শহর মাটি খুঁড়ে আবিষ্কার করেছেন, তার বেশিরভাগই পাওয়া গেছে দক্ষিণ মেক্সিকোর ইউকাতান উপদ্বীপ, বেলাইজ এবং গুয়েতেমালায়। মধ্য আমেরিকার এই অঞ্চলগুলো মূলত গ্রীষ্মপ্রধান। বেশিরভাগ জায়গাই ঘন জঙ্গল আচ্ছাদিত। কাজেই এরকম সম্ভাবনা খুব বেশি যে, মায়াদের হারিয়ে যাওয়া অনেক নিদর্শন এখনো লুকিয়ে রয়েছে ওই জায়গার মাটির নিচে।
গত ২০০ বছরের প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় মায়া সভ্যতা নিয়ে আমার যতটুকু জানতে পেরেছি, তাতেই আমাদের চিন্তা-চেতনায় সাড়া পড়ে গেছে। মায়াদের তৈরি সম্পূর্ণ মৌলিক স্থাপত্য শিল্প প্রমাণ করেছে যে, তারা কারুশিল্পে অত্যন্ত দক্ষ একেকজন শিল্পী ছিলেন।      
তাদের বুদ্ধিমত্তাও ছিল অনেক উন্নত। গণিত এবং জ্যোতির্বিদ্যায় তাদের দখল অসাধারণ। অক্ষে গ্রহের ঘূর্ণন এবং এর সঙ্গে সূর্যের অবস্থানের উপরে ভিত্তি করে দিন রাতের যে তারতম্য হয় এটার হিসাব তারা জানতো। প্রতি বছরে মাত্র দুইদিন (মার্চ ২০ এবং সেপ্টেম্বর ২৩) পৃথিবীর বিষুবরেখা সূর্যের ঠিক মাঝ বরাবর দিয়ে অতিক্রম করে। এটাকে বলে সোলার ইকুইনক্সেস। বছরের এই দুইদিন রাত এবং দিন সমান হয়। মায়ারা এই বিদ্যা ব্যবহার করে তাদের পিরামিড এবং মন্দির এমন সারিবদ্ধভাবে সাজাতো যাতে করে এই বিশেষ দিনে কিছু কুঠুরিতে সূর্যের আলো প্রবেশ করতে পারে। এই কায়দা ব্যাবহার করে তারা আরও অনেক আলোর কারসাজি তৈরি করেছে তাদের পিরামিডে। মেসো আমেরিকায় একমাত্র মায়াদেরই ছিল লেখার জন্য বর্ণমালা। তাদের হাতে লেখা লিপিতে দেখা যায় উদ্ভট দর্শন মায়া হায়ারোগ্লিফ বা বর্ণমালা। 
পৃথিবীর মানুষের জন্য যে বিস্ময় মায়ারা রেখে গেছে সেই বিস্ময়ের জ্যোতি প্রবল। যে কারণে এই সভ্যতার সমাপ্তির প্রক্রিয়াও একইসাথে মানুষের জন্য প্রবল কৌতূহলের একটা বিষয়। 
৬০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে মায়ারা অবস্থান করছিলো উন্নতির শিখরে। তারা জানতো না, এই উত্থানের পরেই আসছে পতন। উত্থানে সময় লাগে, পতনে লাগে না। ৮৫০ খ্রিস্টাব্দের দিকে হঠাৎ দেখা গেলো, মায়ারা তাদের সমৃদ্ধ শহরগুলোকে একটার পর একটা পরিত্যাগ করতে শুরু করেছে এবং পরবর্তী ২০০ বছরেরও কম সময়ের মধ্যে দেখা গেলো, তাদের অসীম গৌরবের খুব সামান্য মাত্র অবশিষ্ট রয়েছে। এরপর বেশ কয়েকবার বিচ্ছিন্ন কিছু পুনরুত্থান ঘটলেও মায়া সভ্যতার জাঁকজমক ততদিনে চিরকালের জন্য হারিয়ে গেছে।  
মায়াদের উত্থান এতোই নাটকীয় ছিল যে শত বছরের গবেষণার পরেও প্রত্নতাত্ত্বিকরা কিছুতেই তাদের পতনের কারণ নিয়ে একমত হতে পারছেন না। খুঁজেতে গেলে দেখা যাবে, রোমান সাম্রাজ্যের পতনের পিছনেও অন্তত একটা বড় কারণ রয়েছে। কিন্তু সেটা মায়াদের ক্ষেত্রে পাওয়া যাচ্ছে না। পতনের গতি প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করে কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন, মায়া সভ্যতা আসলে মারাত্মক কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের শিকার হয়েছিল। যে কারণে তারা বাধ্য হয়ে একেরপর এক শহর ত্যাগ করেছিল। 
মায়া বিলুপ্ত নিয়ে প্রচুর তত্ত্ব চালু রয়েছে। পুরনো জনপ্রিয় তত্ত্বগুলোর মধ্যে রয়েছে- বহিরাক্রমণ, গৃহ যুদ্ধ, বাণিজ্যপথের অবসান ইত্যাদি। কিন্তু ১৯৯০ সালের দিকে মধ্য আমেরিকার জলবায়ুর প্রাচীন ইতিহাস সংগ্রহ করে প্রথম সেটাকে একত্রিত করা হয়। বেরিয়ে আসে একটি নতুন তত্ত্ব এবং এটি খুব দ্রত জনপ্রিয়তা পায়। নতুন এই তত্ত্ব অনুসারে, মায়া সভ্যতার চূড়ান্ত পতন হয়েছিল তীব্র জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে। 
পতনের মাত্র কয়েক শতক আগে তথাকথিত ক্লাসিক্যাল পিরিয়ডে (২৫০ থেকে ৮০০ খ্রিস্টাব্দ) এই সভ্যতার প্রসার ঘটেছিল খুব বেশিমাত্রায়। তৈরি হয়েছিল নতুন নতুন শহর, কৃষিকাজে ফলন ছিল পর্যাপ্ত। জলবায়ু রেকর্ডে (যার বেশিরভাগটাই সংগ্রহ করা হয়েছে গুহার গঠন পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করে) দেখা গেছে, ঐ সময়ে মায়া অঞ্চলগুলোতে তুলনামূলক বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছিল। কিন্তু ঐ একই রেকর্ডে দেখা যায়, ৮২০ খ্রিস্টাব্দের পর থেকে সেখানে প্রায় ৯৫ বছর ধরে চলেছে ভয়াবহ খরা। এগুলোর মধ্যে কোনো কোনো খরা চলেছে দুই তিন যুগ ধরে।          
গবেষকরা যখনই খরার ব্যাপারটা চিহ্নিত করতে পারলেন, তখন থেকেই মায়া সভ্যতার পতনের ধারাবাহিকতার সাথে এর একটা যোগাযোগ দেখতে পেলেন তারা। বেশিরাভাগ ক্লাসিক্যাল মায়া শহরের পতন ঘটেছে ৮৫০ থেকে ৯২৫ সালের মধ্যে। কিন্তু এটা একটা কাকতালীয় যোগাযোগও হতে পারে। খরা এবং মায়ার পতনের যে আঁটসাঁট সময় যোগাযোগ তা থেকে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, নবম শতাব্দীতে যে জলবায়ু পরিবর্তন ঘটেছিল সেটাই ছিল মায়ার মরণের কারণ। 
খরা তত্ত্ব শুনতে আকর্ষণীয় মনে হলেও এর বিরুদ্ধে অন্তত একটি শক্ত প্রমাণ রয়েছে। কারণ, জলবায়ু শুকিয়ে যাওয়ায় বেশিরভাগ মায়া শহর বিলুপ্ত হয়ে গেলেও সব কিন্তু বিলুপ্ত হয় নি। নবম শতকে যে শহরগুলোর পতন হয়েছিল সেগুলো মূলত তাদের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত ছিল। অর্থাৎ এখনকার সময়ের গুয়েতেমালা এবং বেলাইজ অঞ্চলে। কিন্তু উত্তরের ইউকাতান উপদ্বীপে যে শহরগুলো ছিল সেগুলো কিন্তু খুব ভালো মতোই টিকে ছিল। শুধু টিকে ছিল না, বরং আরও সমৃদ্ধ হয়েছিল। 
দক্ষিনের মায়া হারিয়ে গেছে, অথচ উত্তরে ঘটেছে আর প্রসার। সেখানকার সমৃদ্ধ শহরের মধ্যে রয়েছে পৃথিবীর সাত আশ্চর্যের একটি ‘চিচেন ইতজা’। কিন্তু এটা খরা তত্ত্বের সাথে কিছুতেই যায় না। সমালোচকরা বলেন, ‘জলবায়ু যদি দক্ষিণে নিষ্পেষণ চালাতে পারে, তাহলে উত্তরে নয় কেন?’  
উত্তর এবং দক্ষিণ মায়ার এই অসামঞ্জস্যতা সমাধানে নিয়ে বেশ কিছু নতুন ব্যাখ্যা হাজির করেছেন গবেষকরা। কিন্তু এখনো পর্যন্ত কারো তত্ত্বই জিততে পারেনি। বরং সাম্প্রতিক সময়ের একটি নতুন আবিষ্কার দীর্ঘদিনের এই অসামঞ্জস্যতার সমাধানে একটা আশার আলো দেখাতে শুরু করেছে।
যে সমস্ত প্রত্নতাত্ত্বিকরা মায়া সভ্যতা নিয়ে কাজ করেন, তারা দিন তারিখ নিয়ে একটা সঙ্কটে ভোগেন। মায়াদের হাজারো লিপির মধ্যে কোনটাই উপনিবেশ পরবর্তী সময়ে টেকে নি। ক্যাথোলিক যাজক থেকে শুরু করে স্প্যানিশরা পর্যন্ত মায়াদের বই পুড়িয়েছে গণ হারে। এখন পর্যন্ত সর্বসাকুল্যে মোটে ৪টি বই টিকে আছে। কাজেই ঠিক কোন সময়ে মায়া শহর আবার নতুন করে উন্নিত হতে শুরু করে, সেটা বের করার জন্য গবেষকদের ভরসা করতে হয়েছিল পাথরের খোদাই করা মায়া দিনপুঞ্জিতে, সুসজ্জিত মৃৎশিল্পে এবং জৈব পদার্থগুলো থেকে পাওয়া রেডিওকার্বন তারিখের উপরে (কার্বন ডেটিং হচ্ছে কার্বন আইসোটোপ ব্যবহার করে জৈব পদার্থের বয়স নির্ণয় প্রক্রিয়া)।  
আগের গবেষণাগুলোতে দেখা গিয়েছিল, উত্তর মায়া নবম শতকের খরাতেও টিকে ছিল। কিন্তু এবার মায়াদের উপরে সমস্ত তথ্য একত্রিত করা হলো। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটা সভ্যতার উত্থান এবং পতন খুঁজে পেতে হলে সমস্ত তথ্যের ভেতরে একটা সমন্বয় দরকার। সমন্বয়ে যে তথ্যগুলো থাকবে না, সেগুলো খুঁজে বের করলেই একটা সামগ্রিক চিত্র হাজির হবে সামনে। 
গত ডিসেম্বরে প্রকাশিত এই নতুন গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্যের বিজ্ঞানীরা উত্তর মায়া থেকে সংগৃহীত সমস্ত দিন তারিখ একত্রিত করেছেন প্রথমবারের মত। এখানে ইউকাতান উপদ্বীপের ২০০ তারিখের একটা হিসাব রয়েছে। এর অর্ধেকটা পাওয়া গেছে পাথরের খোদাই লিপি থেকে এবং বাকি অর্ধেক কার্বন ডেটিং থেকে। 
গবেষকরা যা খুঁজে পেলেন তাতে কখন এবং কিভাবে মায়া সভ্যতার পতন হয়েছিল সে ব্যাপারে আমাদের চিন্তা ভাবনা অনেকটাই বদলে দিতে পারে। কারণ পূর্বের বিশ্বাস করা খরা তত্ত্ব মতে, খরার সময়কালে উত্তর ও দক্ষিণ মায়ার পতন ঘটেছিল। কিন্তু এবারের গবেষণায় দেখা গেলো, উত্তর মায়াতে পতন হয়েছিল একবার না, দুইবার। প্রথম পতনে তারা টিকে গিয়েছিল কিন্তু পরেরটায় টেকেনি। 
নবম শতকের মাঝামাঝি উত্তর মায়ার পাথরের খোদাই লিপিতে ক্ষয় হয়েছিল ৭০ শতাংশ। কার্বন ডেটিংয়েও এই একই ক্ষয়ের বিন্যাস লক্ষ্য করা গেছে। এটা নির্দেশ করে যে, ওই একই সময়কালে কাঠের তৈরি স্থাপনাগুলোও ক্ষীণ হয়ে গিয়েছিল। কাজেই শুধুমাত্র দক্ষিণের মায়া সভ্যতাই খরাতে বিলুপ্ত হয় নি। বরং প্রমাণে দেখা যাচ্ছে, খরার আঁচড় ভালমতোই লেগেছিল উত্তর মায়াতেও। কিন্তু নবম শতাব্দীতে তাদের পতন না হয়ে চিচেন ইতজার মত আরও স্থাপনার প্রসার ঘটেছিল দশম শতাব্দীতে এসে।  

চিচেন ইতজা
এইবার গল্প মোড় নিয়েছে একটু অন্যদিকে। খরার প্রথম পতনের পর আরেকটি পতন তাহলে কেন হয়েছিল? গবেষকরা খুঁজে পেয়েছেন,  নবম শতাব্দীর শেষ দিকে কাকতালীয়ভাবে সেখানে বৃষ্টিপাত কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছিল। যে কারণে খরা থেকে কিছুটা আরোগ্য লাভ করে উত্তর মায়া। কিন্তু দশম শতক থেকে এগারো শতক পর্যন্ত শহর নির্মাণ এবং পাথর লিপিতে আবার শুরু হয় মন্দা। কিন্তু এখানে গবেষকরা আবিষ্কার করলেন, ঠিক আগেরবারের মতোই এবারের পতনের জন্যও দায়ী খরা। কিন্তু এইবারের খরা নবম শতকের চাইতেও ভয়াবহ। এটাকে ‘মহা খরা’ বলা যেতে পারে। মায়া সভ্যতা প্রথম খরার থেকে রক্ষা পেলেও দ্বিতীয়টার থেকে পায় নি।           
উত্তর মায়ার চিচেন ইতজা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো পতন ঘটলো চিরকালের মতন। তবে দুয়েকটি ব্যতিক্রমি ঘটনা ছিল। উত্তরাঞ্চলের মায়াপান শহর তার মধ্যে একটা। তারা টিকে ছিল তেরো থেকে পনেরো শতক পর্যন্ত। তবে এগুলো প্রথম শ্রেণীর মায়া শহরের কাছে কিছুই না। এগারো শতাব্দিতেই আসলে পতন ঘটেছিল মায়া সভ্যতার। পতনে ভূমিকা রেখেছিল জলবায়ু পরিবর্তন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে কিভাবে? 
বেশিরভাগ প্রত্নতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা অনুসারে এই পতনের সাথে জড়িয়ে রয়েছে কৃষিকাজ। পৃথিবীর অন্য যে কোনো বড় সভ্যতার মতো মায়াও ছিল কৃষি নির্ভর। তাদের জনশক্তির ব্যবহারও নির্ভর করতো এর উপর। খরাতে যখন বছরের পর বছর ফসল উৎপাদন কমে গেলো, তখন প্রথমে তাদের রাজনৈতিক প্রভাব কমে গেলো ধীরে ধীরে। এক সময় সৃষ্টি হলো সামাজিক বিভেদ।    
কিন্তু খরা তত্ত্বের প্রবর্তকরা পর্যন্ত স্বীকার করেন যে, মায়া পতনের চিত্রটি এখনো অনেক অস্পষ্ট। গোটা ব্যাপারটা এর থেকেও স্পষ্ট হওয়া উচিৎ।     
টেক্সাসের বেলোর বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক জুলি হোগার্থ ডিসেম্বরে প্রকাশিত মায়াদের জলবায়ু বিশ্লেষণে সহ-নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা এটা জানি যে, নবম শতকের খরাতে মায়া অঞ্চলে যুদ্ধ-বিগ্রহ বেড়ে গিয়েছিল খুব এবং বড় ধরনের সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছিল।’ 
যে কোনো সভ্যতাকে ধ্বংস করার জন্য আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব খুবই কার্যকর একটি পন্থা। এটা সম্ভব যে মায়ারা যুদ্ধ করে নিজেদের নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিল। কিন্তু তাতেও গবেষকদের পাওয়া দিন তারিখ এবং খরার ব্যাপারটা নিয়ে অনেক প্রশ্ন থেকে যায়। এরকমও হতে পারে যে, এখানে দুটো জিনিসের একটা মিশেল ছিল। খরাতে যখন খাদ্য সঙ্কট দেখা দিল, তখন সীমিত খাবার সংগ্রহের জন্য প্রতিযোগিতা তীব্র আকার ধারণ করার কথা। হয়তো খাবারের জন্য দাঙ্গা এমন একটা পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, সেখান থেকে তারা ফিরতে পারেনি। নিস্থুরভাবে হত্যা করেছে একে অন্যকে। 
কিন্তু যুদ্ধ-বিগ্রহ বাদ দিয়ে আর কি ব্যাখ্যা থাকতে পারে? যুদ্ধ-বিগ্রহের কথা বাদ দিলে অন্তত আর একটি ব্যাখ্যা রয়েছে। এমনো হতে পারে যে,  মায়াদের পতনের জন্য তাদের অন্ধকার দিকগুলো দায়ী ছিল না, বরং দায়ী ছিল তাদের মেধা। কারণ মায়ারা শুধুমাত্র নিপুণ মৃৎশিল্পীই ছিলেন না, তারা প্রকৃতিতে অনেকে পরিবর্তনও করেছিল।  
লাখ লাখ মানুষের খাবার চাহিদা মেটানোর জন্য পরিকল্পনা করে বিশাল আকারের খাল খনন করেছিল তারা। এসব খালের দৈর্ঘ্য ছিল অনেকসময় কয়েকশো মাইল পর্যন্ত। খালের পানি তারা ব্যবহার করেছে অনুর্বর জমি আবাদি করার জন্য। এছাড়া তারা শহর এবং কৃষি জমি তৈরির জন্য জঙ্গলের একটা বড় অংশ সাফ করে ফেলেছিল।    
অনেক গবেষক মনে করেন পরিবেশের উপরে মায়াদের এই সুকৌশল পরিবর্তনই তাদের পতনের পথ পরিষ্কার করে দিয়েছিল এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে আরও খারাপ অবস্থায় টেনে নিয়ে গিয়েছিল। যেমন, বন জঙ্গল উজাড় করে আবাদি জমি তৈরির ফলে শুস্ক স্থানের প্রসার ঘটেছিল এবং খরার সময় অবস্থা দাঁড়িয়েছিল বেগতিক। কৃষি ফলন ভালো হওয়ায় তাদের জনসংখ্যা বেড়ে গিয়েছিল অনেক, কিন্তু শুস্ক আবহাওয়ায় যখন খাদ্য ঘাটতি দেখা দিল তখন সেটা মোকাবেলা করার অবস্থা ছিল না।  
মায়া সভ্যতার বিলুপ্তি নিয়ে আমাদের অজানা যে কারণই থাকুক না কেন, পতনের পরে যে সমস্ত মানুষ টিকে ছিলেন তাদের নিয়তি কি হয়েছিল সেটা অন্তত আমরা জানি। ১০৫০ খ্রিস্টাব্দ থেকে এই টিকে থাকা মায়ারা বেছে নিয়েছিলেন পালানোর পথ। পূর্বপুরুষের বসতভিটা ত্যাগ করে যাত্রা করেছিলেন ক্যারিবিয়ান উপকূলের দিকে কিংবা অন্য কোনো পানির উৎসের দিকে। মায়াবাসীর মায়া প্রস্থানের পেছনে ক্ষুধাতৃষ্ণার তাড়না ছিল সবচেয়ে বেশি। একসময়ের অতি সমৃদ্ধ এই জাতির কল্পনাতেও ছিলো না শেষকালে তাদের এই নিয়তি হবে।      
প্রকৃতি যাতে সহায় থাকে সে জন্যই কিন্তু মায়ারা বহু ঈশ্বরের পূজা করতো। মায়া রাজারাদের প্রধান দায়িত্বগুলোর মধ্যে একটা ছিল, তাদের ঈশ্বরের সাথে সমঝোতা করে একটা জলসিক্ত বছর এবং বাড়ন্ত ফসলের নিশ্চয়তা প্রদান করা। প্রত্নতাত্ত্বিকরা মায়া রাজ্যের কমবেশি সবজায়গায় মানুষের এমন কিছু হাড়গোড় খুঁজে পেয়েছেন যাতে বোঝা গেছে মায়ারা দেবতাকে তুষ্ট রাখার জন্য বলি দিত। একসময় মায়া রাজ্যে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়েছে, ফসল ফলেছে রাশিরাশি। হাসি আনন্দে তারা সৃষ্টি করেছে নতুন নতুন শহর। মায়াবাসী তখন কৃতজ্ঞ চিত্তে ভেবেছে, ঈশ্বর তাদের প্রার্থনা কবুল করেছে।