মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র


লক্ষ লক্ষ বাঙালির আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত মহান স্বাধীনতা, মুক্তি, মুক্তিযুদ্ধ, বিজয়-উল্লাস আর আত্মা-উন্মাদনার নাম বাংলাদেশ; যেখানে প্রতিনিয়তই ইতিহাসে শক্তিশালী অবদান রেখে চলেছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র। মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন প্রেক্ষাপট নিয়ে নির্মিত হয়েছে পূর্ণদৈর্ঘ্য, স্বল্পদৈর্ঘ্য কিংবা প্রামাণ্যচিত্র। এখানে উঠে এসেছে বাঙালির দেশপ্রেম আর দেশাত্ববোধ, যা ব্যক্তি থেকে শুরু করে সমাজ, জাতি আর রাষ্ট্রকে গৌরবের শিখরে অধিষ্ঠিত করে। একই সাথে বিশ্ব দরবারে নিজেদের পরিচয় করিয়ে দেয়, আমরা বাঙালি বীরের জাতি।
যদিও চলচ্চিত্র গবেষকরা বলে থাকেন, শুধু রাজনৈতিক মতবিরোধ আর সঠিক ইতিহাসসমৃদ্ধ কাহিনী না থাকায় মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যেভাবে চলচ্চিত্রে নির্মিত হয়েছে, সে তুলনায় সমৃদ্ধ হতে পারেনি বাংলা চলচ্চিত্র। তবে এমন অনেক আলোচনা আছে যেখানে বলা হয়, বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এখন পর্যন্ত যে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে সেটাকে ছোট আকারে ভাবার অবকাশ কম।
জানা গেছে, যুদ্ধবস্থায় মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কিছু পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়। যুদ্ধপরবর্তী সময়ে অনেক চলচ্চিত্র নির্মাতাই এগিয়ে আসেন মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক চলচ্চিত্র নির্মাণে। ১৯৭২, ১৯৭৩ এবং ১৯৭৪ সালে মোট দশটি মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক চলচ্চিত্র তৈরি হয়। কিন্তু ১৯৭৫ সালে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কোন চলচ্চিত্র নির্মিত হয়নি, মূলত রাজনৈতিক কারণে।
তবে এক্ষেত্রে পঞ্চাশের দশকের ভাষা আন্দোলনই ৭১ সালে এসে এক ধরনের শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। সেসময় ভাষা আন্দোলন আর মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নির্মিত হয় কয়েকটি ছবি। ৫২’র ভাষা আন্দোলন, ৬৮-৬৯’র গণআন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোতে বিক্ষোভে ফেটে পড়া রাজপথে দাবি আদায়ে প্রতিবাদী মানুষের জীবনচিত্র চলচ্চিত্রের রূপালি পর্দায় তুলে ধরেছিলেন জহির রায়হান। মুক্তিযুদ্ধ নির্মাণ করেন ‘জীবন থেকে নেয়া’।
জহির রায়হান স্বাধীনতাযুদ্ধ চলাকালের দলিলপত্র ‘লেট দেয়ার বি লাইট’ নির্মাণ চলাকালীন সময়ে স্বাধীনতার দেড় মাস পর রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়ে যান। এরপর আর এ ছবিটি  আলোর মুখ দেখেনি। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে স্বল্পদৈর্ঘ্য এবং প্রামাণ্যচিত্রের তালিকাও বেশ বড় বলা চলে। ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে’, ‘সেই রাতের কথা বলতে এসেছি’, ‘শরৎ ৭১’, ‘দি কান্ট্রি অব ডিজাস্টার’, ‘জয় বাংলা ও বহমান ‘একাত্তরের যিশু’, ‘আগামী’, ‘হুলিয়া’, ‘সূচনা’, ‘প্রত্যাবর্তন’, ‘ওরা আসছে’, ‘ধূসরযাত্রা’,  ‘আমি স্বাধীনতা এনেছি’, ‘অনেক কথার একটি কথা’, ‘অন্যযোদ্ধা’, ‘কাল রাত্রি’, ‘অস্তিত্বে আমাদের দেশ’, ‘শিলালিপি’, ‘রিফুইজি ৭১’, ‘আমরা তোমাদের ভুলব না’, ‘একজন মুক্তিযোদ্ধা’, ‘দুরন্ত’, ‘বখাটে’সহ আরও অনেক।
এছাড়া ৬৮-৬৯’ সালে নির্মিত ফখরুল আলম পরিচালিত ‘জয়বাংলা’ নামের ছবিটি পাকিস্তানি সেন্সর বোর্ড আটকে রাখে। তবে পরে তার মুক্তি মিলে ১৯৭২ সালে। স্বাধীনতা অর্জনের পর মুক্তি পায় মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রথম চলচ্চিত্র চাষী নজরুল ইসলাম পরিচালিত ‘ওরা ১১ জন’। ছবিটি প্রযোজনা করেছিলেন মাসুদ পারভেজ। জাগ্রত কথাচিত্রের ব্যানারে। এটিই প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনীচিত্র যার কাহিনীকার আল মাসুদ, চিত্রনাট্যকার কাজী আজিজ, সংলাপ লিখেছিলেন এটিএম শামসুজ্জামান। আর অভিনয় করেছিলেন খসরু, শাবানা, রাজ্জাক, নূতন, সুমিতা দেবী, রওশন জামিল, এটিএম শামসুজ্জামানসহ আরও অনেকে। এই এগারোজনের দশজনই বাস্তবের মুক্তিযোদ্ধা, সিনেমা নির্মাণে ব্যবহৃত অস্ত্রশস্ত্র ও বুলেটের সবকটিই আসল। ১১ই আগস্ট ১৯৭২ এ মুক্তি পায় এই চলচ্চিত্রটি। ১৯৭২ সালে মুক্তি পায় সুভাষ দত্ত নির্মিত ‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’, আনন্দ পরিচালিত ‘বাঘা বাঙালি’, মমতাজ আলী পরিচালিত ‘রক্তাক্ত বাংলা’ প্রভৃতি।
এরপর প্রয়াত চলচ্চিত্রকার আলমগীর কবির ১৯৭৩ সলে নির্মাণ করেন ‘ধীরে বহে মেঘনা’। খান আতাউর রহমানের ‘আবার তোরা মানুষ হ’, কবীর আনোয়ারের ‘স্লোগান’, আলমগীর কুমকুমের ‘আমার জন্মভূমি’ প্রভৃতি। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বিশৃংঙ্খল পরিস্থিতি ফুটে ওঠে ১৯৭৪ সালে নির্মিত নারায়ণ ঘোষ মিতার ‘আলোর মিছিল’ ছবিতে। একই বছর মুক্তি পায় চাষী নজরুল ইসলামের ‘সংগ্রাম’ ও এস আলীর ‘বাংলার ২৪ বছর’।
১৯৭৪-পরবর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাণে আবার ধীরগতি লক্ষণীয়। ১৯৭৬ সালে মুক্তি পায় হারুন-অর-রশীদের ‘মেঘের অনেক রং’। ১৯৭৭ সালে মুক্তি পাওয়া আবদুস সামাদের ‘সূর্যগ্রহণ’ ছবিতেও এসেছে মুক্তিযুদ্ধের কথা। ১৯৭৫-পরবর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছবি নির্মাণ কমে যায়। ১৯৮১ সালে মুক্তি পায় শহীদুল হক পরিচালিত ‘কলমীলতা’ ছবিটি। প্রায় একই সময়ে মুক্তি পায় এ জে মিন্টুর ‘বাঁধন হারা’ আর মতিন রহমানের ‘চিৎকার’।
নব্বইয়ের দশকে এসে মোরশেদুল ইসলামের ‘আগামী, তানভীর মোকম্মেলের ‘হুলিয়া’ ও ‘নদীর নাম মধুমতি’, নাসিরউদ্দিন ইউসুফের ‘একাত্তরের যীশু’, মোস্তফা কামালের ‘প্রত্যাবর্তন’, আবু সাইয়ীদের ‘ধূসর যাত্রা’ প্রভৃতি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক স্বল্পদৈর্ঘের আলোচিত ছবি। একাত্তরে মার্কিন সাংবাদিক লিয়ার লেভিনের ধারণ করা ফুটেজ নিয়ে প্রয়াত চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদ নির্মাণ করেন প্রামাণ্য চলচ্চিত্র ‘মুক্তির গান’।
প্রায় কাছাকাছি সময়ে কয়েকটি শিশুতোষ মুক্তিযুদ্ধের ছবি নির্মিত হয়। যার মধ্যে দেবাশীষ সরকারের ‘শোভনের একাত্তর’, রফিকুল বারী চৌধুরীর ‘বাংলা মায়ের দামাল ছেলে’, জাঁ-নেসার ওসমানের ‘দুর্জয়’, হারুনুর রশীদের ‘আমরা তোমাদের ভুলব না’, বাদল রহমানের ‘ছানা ও মুক্তিযুদ্ধ’, ছটকু আহমেদের ‘মুক্তিযুদ্ধ ও জীবন’, মান্নান হীরার ‘একাত্তরের রঙপেন্সিল’ উল্লেখযোগ্য।
১৯৯৪ সালে কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ নির্মিত প্রথম ছবি ‘আগুনের পরশমণি’। ১৯৯৮ সালে নির্মিত হুমায়ূন আহমেদের দ্বিতীয় ছবি ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’। কথাশিল্পী সেলিনা হোসেনের উপন্যাস অবলম্বনে চাষী নজরুল ইসলাম ১৯৯৮ সালে নির্মাণ করেন আরেকটি মুক্তিযুদ্ধের ছবি ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’। ২০০২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত প্রয়াত চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ নির্মিত ‘মাটির ময়না’ছবিটিও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় নির্মিত।
পরিচালক চাষী নজরুল ইসলাম ২০০৪ সালে কথা সাহিত্যিক রাবেয়া খাতুনের উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি করেন ছবি ‘মেঘের পর মেঘ’। হুমায়ুন আহমেদ তৈরি করেন ‘শ্যামলছায়া’ এবং অভিনেতা তৌকির  আহমেদ নির্মাণ করেন ‘জয়যাত্রা’। মুহম্মদ জাফর ইকবালের উপন্যাস অবলম্বনে মোরশেদুল ইসলাম নির্মাণ করেন ‘আমার বন্ধু রাশেদ’। এছাড়া ২০০৯ সালে মুক্তি পায় তানভীর মোকাম্মেলের ‘রাবেয়া’। এরপর একটা সময় গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র নির্মাণে নবযুগের সূচনা করেন মুক্তিযোদ্ধা ও নাট্যব্যক্তিত্ব নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু। সৈয়দ শামসুল হকের ‘নিষিদ্ধ লোবান’ উপন্যাস অবলম্বনে নির্মাণ করেন ‘গেরিলা’ ছবিটি।