স্বপ্নের ‘আইটিপুর’ রাফুর

 

দিনাজপুর শহরের পলিটেকনিক্যাল কলেজের মোড়ে দাঁড়ালেই পাঁচতলা ভবনের ওপর উঁচু টাওয়ারটা চোখে পড়ে। একটু এগোলে দেখতে পাবেন সাইনবোর্ড। তাতে ইংরেজিতে লেখা ‘রাফুসফট’। 

 স্বপ্নের ‘আইটিপুর ’ রাফুর

৯ মে সন্ধ্যায় আমরা বসে ছিলাম রাফুসফটের প্রতিষ্ঠাতা এস এম রাফায়েত হোসেনের অফিস ঘরে। তাঁর ডাকনাম রাফু। তথ্যপ্রযুক্তিতে দিনাজপুরের অগ্রগতি, আর এর পেছনের তরুণদের কথা বলতে গিয়ে রাফায়েত হোসেন তখন ভীষণ উত্তেজিত! কখনো নড়েচড়ে বসছেন, কখনো চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে যাচ্ছেন। ‘আস্তে ভাই আস্তে, এক এক করে বলেন’—আমরা তাঁকে শান্ত করার চেষ্টা করি।
রাফায়েত হোসেন জানালেন কীভাবে তাঁরা দিনাজপুরকে ‘ডিজিটাল দিনাজপুর’ হিসেবে গড়ে তুলছেন। কেমন করে এই জেলা শহরের নিরিবিলিতে বসে দেশ-বিদেশের নামী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করছে তাঁর দল। দিনাজপুরেই তাঁরা যেন দেখতে চান ‘আইটিপুর’।
দিনাজপুর সদর উপজেলা পরিষদের আশপাশের এলাকা, নিমনগর বালুবাড়ি, ফুলবাড়ি বাসস্ট্যান্ড...এমন কয়েকটি জায়গায় বিনা মূল্যে তারহীন ওয়াই–ফাই ইন্টারনেট ব্যবহারের সুবিধা পাওয়া যাবে। সরকারি সহায়তায় এই ব্যবস্থা করে দিয়েছে রাফুসফট। রাফায়েত হোসেনের বক্তব্য, ‘ছেলেমেয়েরা ইন্টারনেট ব্যবহার করুক। আগ্রহ তৈরি হোক। এটাই আমাদের চাওয়া।’
সে চাওয়াকে পাওয়াতে পরিণত করতে তাঁদের চেষ্টার কোনো অন্ত নেই। ‘শহরের যেকোনো জায়গায় কেউ যদি প্রোগ্রামিং বা কম্পিউটার বিষয়ক কর্মশালা করতে চায়, আমরা লোক পাঠিয়ে দিই। শুধু যাওয়া-আসার খরচটা দেবেন। ব্যস, লোক হাজির,’ বলছিলেন তিনি। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানটিতে প্রোগ্রামিং, ওয়েবসাইট তৈরি ও গ্রাফিক ডিজাইন, সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন, নেটওয়ার্কিংসহ বেশ কিছু বিষয়ে কোর্স চালু আছে। নির্দিষ্ট ফি দিয়ে যে-কেউ এসব কোর্সে অংশ নিতে পারবেন। বেকার তরুণদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দিতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানালেন রাফায়েত। বলছিলেন, ‘এখান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে অনেকেই স্বাবলম্বী হয়েছে। আমার প্রতিষ্ঠানেও কেউ কেউ কাজ করছে। ছোট ছেলেমেয়েগুলো যে কী ভালো কাজ পারে, আপনি না দেখলে বিশ্বাস করবেন না।’
বর্তমানে রাফুসফটের কাজের পরিধিটাও বিশাল। অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন প্রকল্প অনুমোদিত ওয়েবসাইটগুলোর নিরাপত্তার দিকটি দেখাশোনার দায়িত্ব তাঁদের। এ ছাড়া দেশের বাইরেও বেশ কিছু সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত আছেন তাঁরা। দেশি-বিদেশি বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজের স্বীকৃতির সনদ ঝুলছে রাফুসফটের অফিসঘরে।
এই সবকিছুর শুরুটা হয়েছিল কোবরা অ্যান্টিভাইরাস দিয়ে। রাফায়েত হোসেনের হাতেই তৈরি হয়েছিল এই সফটওয়্যার। ছয়–সাত বছর আগে দেশে তৈরি অ্যান্টিভাইরাস হিসেবে এটি বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। এরপর মাইক্রোসফট যখন একের পর এক উইন্ডোজের নতুন সংস্করণ বাজারে আনতে থাকল, তখন নিবন্ধন জটিলতায় অ্যান্টিভাইরাসটির স্বত্ব ভিনদেশি একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করে দিয়েছিলেন। রাফায়েত বলছিলেন, ‘কোবরা অ্যান্টিভাইরাসই আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন। বর্তমানে ভেক্রাস বিডি লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠান কোবরা নেক্সট জেনারেশন অ্যান্টিভাইরাস নিয়ে আসছে। সোনামণি গার্ড (প্যারেন্টাল কন্ট্রোল) ও কোবরা নেক্সট জেনারেশন ফায়ারওয়াল তৈরি করাটাও আমাদের পছন্দের কাজগুলোর মধ্যে অন্যতম।’
এতসব কাজের ভিড়ে রাফায়েত হোসেনের সব ভাবনার কেন্দ্রে সব সময় থাকে দিনাজপুর। বলছিলেন, ‘আমরা তো আর ভ্যাটিকান সিটি বানাতে পারব না। কিন্তু আমাদের শহরের তরুণদের নিয়ে আমরা আমাদের মতো করে দিনাজপুরকে তথ্যপ্রযুক্তির দিক দিয়ে উন্নত একটা শহর হিসেবে গড়ে তুলতে চাই।

দিনাজপুর শহরের পলিটেকনিক্যাল কলেজের মোড়ে দাঁড়ালেই পাঁচতলা ভবনের ওপর উঁচু টাওয়ারটা চোখে পড়ে। একটু এগোলে দেখতে পাবেন সাইনবোর্ড। তাতে ইংরেজিতে লেখা ‘রাফুসফট’।