অ‘সাধারণ’দের গল্প


সম্প্রতি আমেরিকার রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামার ছোট মেয়ে সাশা ওবামার রেষ্টুরেন্টে খাবার পরিবেশক হিসেবে কাজ করার বিষয়টি নাড়া দিয়েছে সারাবিশ্বকে। কিন্তু আপনি কি জানেন যে, এই তালিকায় কেবল সাশা একাই নন, তার সাথে আছেন আরো অনেকে। যারা প্রেসিডেন্ট বা প্রেসিডেন্টের ছেলেমেয়ে হয়েও চলে গেছেন সাধারণের কাতারে। কাজ করেছেন তাদের সাথে। বিশেষ করে এমন অনেক রাষ্ট্রপতিকে পাওয়া যাবে যাদের রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগের কাজগুলো ছিল নিতান্তই তুচ্ছ ও হাস্যকর। চলুন তাহলে চোখ বুলিয়ে আসি এমনই কিছু বিষয়ের ওপরে


মালিয়া ওবামা-প্রোডাকশন অ্যাসিস্টেন্ট
অনেক আগে থেকেই হোয়াইট হাউজ আর রাজনৈতিক চাকচিক্যের বাইরে নিজের ভালোলাগার জায়গাকে খুঁজে পেয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার বড় কন্যা মালিয়া ওবামা। ১৬ বছর বয়সেই তাই রাজনীতি ছেড়ে ক্যামেরার দিকে ঝুঁকে পড়েন এই কিশোরী। নিজের অনেকটা সময় কাটিয়ে দেন তিনি পরিচালক স্টিভেন স্পিলবার্গ এবং হ্যালি বেরীর সিবিএস টিভি শো এক্সট্যান্টের প্রোডাকশন অ্যাসিস্টেন্ট হিসেবে কাজ করে। পরবর্তীতে গার্লস নামক আরেকটি টিভি শোতেও কাজ করেন মালিয়া। যদিও সেই শোতে করা তার কাজ বেশ বিব্রত করে সবাইকে। সত্য বলতে, আমেরিকার প্রেসিডেন্টের মেয়েকে যে কেউ প্রোডাকশন অ্যাসিস্টেন্ট হিসেবে দেখতে অস্বস্তিবোধ করতেই পারেন!


নাজাত বেল কাসিম-ভেড়ার রাখাল
বেশিদিন আগের কথা নয়। নাজাত বেল কাসিমের কথা মনে আছে নিশ্চয়ই আপনার? বর্তমানে ফ্রান্সের প্রথম নারী শিক্ষামন্ত্রী তিনি। কিন্তু একটা সময় প্রয়োজনের তাগিদে ভেড়ার রাখাল হিসেবে কাজ করতে হয়েছে বিল কাসিমকে। বাবা ছিলেন নির্মাণশিল্পী। অন্যের বাড়ি-ঘর তৈরি করতেই দিন পার হতো তার। তবে সেটুকু কাজ নিজের সংসার চালানোর জন্য যথেষ্ট ছিল না। ৭জন ছেলেমেয়ের ভেতরে দ্বিতীয় নাজাতকেও তাই হাত লাগাতে হতো কাজে। মেষ চড়াতে পাঠিয়ে দিতেন মা ছোট্ট মেয়েটিকে। দিন শেষে সন্ধ্যাবেলা মেষের দুধ বাজারে বিক্রি করে এসে সেই দুধ বিক্রির টাকা মায়ের হাতে দিয়ে তবে ছিল তার ছুটি। সারাদিন রোদের প্রখর তাপে ক্লান্ত হয়ে মেয়েটি বাড়ি ফিরতো ঠিকই, তবে আর সবার মতো ঘুমের অতলে তলিয়ে যেতেন না কখনোই। সারাদিনের কষ্ট ভুলে গিয়ে নিজেদের ছোট্ট ঘরের আলো-অন্ধকার মেশানো কোণে বসে পড়তেন ছোট্ট একটি প্রদীপ আর বই নিয়ে। না! খুব বেশিকিছু ইচ্ছে ছিল না নাজাতের। তবু মনে মনে নিশ্চয়ই জানতেন তিনি একমাত্র পড়াশোনাই তাকে সত্যিকারের আলো দিতে পারে। মুক্তি দিতে পারে তার পরিবারকে এই কষ্ট থেকে।

১৯৭৭ সালে নি চিকারের মরোক্কান গ্রামাঞ্চলে অবস্থিত নাদোরের ঠিক পাশের একটি গ্রামেই জন্ম নেন ছোট্ট নাজাত। তবে সেখানে খুব বেশিদিন থাকা হয়নি তার। ১৯৮২ সালেই মা আর বড় বোন ফাতিয়াহের হাত ধরে এমিয়েনের একটি আধা-শহরাঞ্চলে চলে যান তিনি। ছোটবেলাতে কিছু বুঝে ওঠার আগেই হয়ে যান ইমিগ্রেন্ট। তবে পরিবারের দারিদ্র্যতা বা মরোক্ক থেকে ফ্রান্স পর্যন্ত নিজের যাযাবর জীবন কোনোটিই দমিয়ে রাখতে পারেনি নাজাতকে। নিজের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় পড়াশোনাকে ধরে রাখেন তিনি। নিজের সাহসী মনোভাবকে জড়িয়ে ধরে শেষ পর্যন্ত ফ্রান্সেই নিজের পড়াশোনা শেষ করেন তিনি। ২০০২ সালে স্নাতক পাশ করেন প্যারিস ইনস্টিটিউটস অব পলিটিক্যাল স্টাডিজ থেকে। তবে এটুকুতেই থেমে থাকেননি নাজাত। পড়াশোনা শেষ করার সাথে সাথে যোগ দেন ফ্রান্সের সমাজতান্ত্রিক দলে। তারপর? তারপরের গল্পটি কেবলই সামনে এগোনোর। পথে অনেক চড়াই-উত্রাই এসেছে, এসেছে মানসিক চাপ আর নানারকম সমস্যার ধাক্কা। তবে তাতে এতোটুকু দমে যাননি সেদিনের সেই ছোট্ট নাজাত বেল কাসিম। যাকে কি-না আজ পুরো পৃথিবী চেনে এক নামে। ফ্রান্সের শিক্ষামন্ত্রী নাজাত বেল কাসিম নামে।


জর্জ ওয়াশিংটন
রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে জমি মাপার করার কাজ করতেন ওয়াশিংটন। এর অর্থ, একটি জমি পরিমাপ করার জন্য সেটার চারপাশ ও মাথার ওপরের সবটুকু জায়গা মেপে নেওয়া। ১৭৪৯ সালে নিজের রাজ্যের জমি পরিমাপক হিসেবে কাজ করতেন জর্জ ওয়াশিংটন।


সাশা ওবামা-ওয়েটার
বড় বোনের চেয়ে খুব একটা পিছিয়ে নেই সাশা ওবামাও। পৃথিবীর কোনো কাজ যে ছোট নয়, আর প্রতিটি কাজ ও তার অবস্থানের যে একটা নির্দিষ্ট সম্মান রয়েছে সেটাই যেন কিছুদিন আগে বুঝিয়ে দেন সাশা রেষ্টুরেন্টে খাবার পরিবেশক হিসেবে কাজ করে। ১৫ বছর বয়সী সাশা কিছুদিন আগেই গরমের ছুটিতে ম্যাসাচুসেটসে অবস্থিত বিজনেস ইন মার্থাস ভিনিয়ার্ডে সামুদ্রিক খাবারের পরিবেশক হিসেবে কাজ শুরু করেন। পরিচয় গোপনের জন্য সাশা নয় বরং নিজের আসল নাম নাতাশা ব্যবহার করেন তিনি। বেশ কিছুদিন কাজ করার পর হঠাত্ একদিন তার সহকর্মীরা লক্ষ্য করেন যে, দোকানের চারপাশে প্রতিদিনই ৬জন দেহরক্ষী ঘোরাফেরা করেন। সেখান থেকেই তাদের মনে কৌতুহল জাগে আর খোঁজ নিতে গিয়ে জানতে পারেন যে, এতোদিন যে বাচ্চা মেয়েটির সাথে তারা কাজ করেছেন তিনি আর কেউ নন আমেরিকার রাষ্ট্রপতির ছোট মেয়ে সাশা ওবামা।


হঠাত্ করেই রাষ্ট্রপতি ডাক্তার যখন রাষ্ট্রপতি
প্রেসিডেন্ট গুরবাঙ্গুলী বার্দিমুখামেদভ। তুর্কমেনিসতানের এই রাষ্ট্রপতি ছিলেন দেশটির তত্কালীন একনায়ক সাপারমুরাত নিয়াজভের দাঁতের ডাক্তার। ডাক্তারকে প্রচণ্ড বিশ্বাস করতেন নিয়াজভ। ফলে নিজের মৃত্যুর পর রাষ্ট্রপতির পদে ডাক্তারকেই বসানোর জন্য মনোস্থির করেন তিনি। এই সুযোগে গুরবাঙ্গুলী হয়ে যান তুর্কমেনিস্তানের রাষ্ট্রপতি!

ডিজে থেকে প্রেসিডেন্ট
বলছিলাম মাদাগাস্কারের সাবেক রাষ্ট্রপতি আন্দ্রে রাজোয়েলিনার কথা। খুব সাধারণ একজন ডিজে ছিলেন এই মানুষটি। তবে তার হাতে একটি ক্ষমতা বেশ ভালোভাবেই ছিল। আর সেটি হচ্ছে নিজের পপ রেডিও, রেডিও ভাইভার ক্ষমতা। এই একটি রেডিওর মাধ্যমেই পুরো দেশকে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন তিনি তত্কালীন শাসনের বিরুদ্ধে আর ছিনিয়ে নেন রাষ্ট্র ক্ষমতা। অবশ্য কিছুদিন বাদেই তাকে সরে যেতে হয় এই পদ থেকে।


আমেরিকার রাষ্ট্রপতিদের অতি সাধারণ জীবিকা


হেনরী ট্রুম্যান
এটম বোম ফেলার জন্য সবচেয়ে বেশি আলোচিত হেনরী ট্রুম্যানের জীবনটা একেবারে গল্পের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। বিশেষ করে রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে তার পেশা কী ছিল সেটা জানলে হয়তো খানিকটা অবাকই হবেন আপনি। কারণ রাজনীতির ধারে-কাছেও ছিলেন না রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে। সেসময় সাধারণ একজন দর্জি হিসেবে নিজের জীবিকা নির্বাহ করতেন তিনি।


মডেল থেকে রাষ্ট্রপতি!
স্লোভেনিয়ার রাষ্ট্রপতি বরাট পাহোর কলেজ জীবনে নিজের জীবিকা নির্বাহের জন্য মডেলিং করা শুরু করেন। পরবর্তীতে ২০১২ সালে ক্ষমতায় আসেন তিনি। তবে তাই বলে অতীত তার পিছু ছাড়েনি। প্রতিপক্ষ সবসময়ই তাকে বার্বিডল বলে ক্ষেপাতে ভালোবাসে।

আব্রাহাম লিংকন
মুদি দোকানে কিছুদিন কাজ করার পর একটা সময় আমেরিকার ১৬তম রাষ্ট্রপতি আব্রাহাম লিংকন নিজের এলাকার ডাকপিয়ন হিসেবে কাজ করেন। তবে এতেই শেষ নয়, রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে ডাকপিয়ন থেকে তিনি ধীরে ধীরে চলে আসেন জমি পরিমাপক ও আইন পেশাতেও। 

লিখেসেন সাদিয়া ইসলাম বৃষ্টি দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত ।