ট্রাম্পের ‘চোখের মণি’


যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালির তারকা উদ্যোক্তাদের মধ্যে অধিকাংশই ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিপক্ষে ছিলেন। একজন ছিলেন ট্রাম্পের ঘোর সমর্থক। তিনি পিটার থায়েল। সিলিকন ভ্যালির অন্য তারকা উদ্যোক্তারা যখন ট্রাম্পকে প্রত্যাখ্যান করেন, তখন ট্রাম্পের পক্ষে দাঁড়ান কোটিপতি এই উদ্যোক্তা। নির্বাচনী প্রচারে নির্বাহী কমিটির সদস্য হিসেবে কাজ করেন। ৮ নভেম্বরের নির্বাচনে ট্রাম্প জিতে যাওয়ায় পিটার থায়েলও প্রযুক্তি বিশ্বে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবেন।
 

 
মার্কিন নির্বাচনে ট্রাম্পের জয়ের পর এখন প্রযুক্তি ও উদ্যোগসংক্রান্ত সব বিষয়েই ট্রাম্পের চোখের মণি হয়ে উঠেছেন ৪৯ বছর বয়সী এই উদ্যোক্তা।

থায়েলের জন্ম জার্মানিতে। তাঁর বয়স যখন এক বছর, তখন তাঁর পরিবার যুক্তরাষ্ট্রে চলে আসে এবং সানফ্রান্সিসকো বে এরিয়াতে বসবাস শুরু করে। স্ট্যানফোর্ডে পড়াশোনা করেন দর্শনশাস্ত্রে। পরে আইন বিষয়ে ডিগ্রি নেন।

ফেসবুকে বিনিয়োগ ও পেপ্যাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে থায়েলের বড় সাফল্য আসে। ম্যাক্স লেভচিন ও এলন মাস্কের (গাড়ি নির্মাতা টেসলার প্রতিষ্ঠাতা) সঙ্গে পেপ্যাল প্রতিষ্ঠাতা করেন তিনি।

মার্কিন নির্বাচনের আগে যখন তিনি ট্রাম্পের পক্ষে তাঁর সমর্থন ঘোষণা করেন, সিলিকন ভ্যালির অনেকেই তাঁর নিন্দা শুরু করেন। ফেসবুক বোর্ড থেকে এবং সিলিকন ভ্যালির ওয়াই কমবাইনেটর নামের প্রতিষ্ঠানের পরামর্শক পদ থেকে তাঁকে সরে দাঁড়ানোর আহ্বান জানানো হয়। যখন অধিকাংশ মার্কিন গণমাধ্যম ট্রাম্পকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে অযোগ্য বলে ঘোষণা করে, তখন থায়েল সতর্ক করে বলেন, মিডিয়া ট্রাম্পকে সব সময় আক্ষরিকভাবে নিয়েছে। কখনো তাঁকে গুরুত্ব দিয়ে নেয়নি। কিন্তু ভোটাররা ঠিক উল্টোটা ভেবেছেন। তাঁরা ট্রাম্পকে গুরুত্ব দিয়েছেন।

পিটার থায়েল বিতর্কিত মতামত তুলে ধরতে কখনো পিছপা হননি। ১৯৯৯ সালে তিনি থায়েল ও ডেভিড স্যাকস মিলে ‘দ্য ডাইভারসিটি মিথ’ নামের একটি বই লেখেন, যেখানে কলেজগুলোর বৈচিত্র্যময় বিষয়ে সমালোচনা করা হয়।

থায়েল দাবা খেলোয়াড় হিসেবে বেশ পরিচিত। যুক্তরাষ্ট্রের ২১ বছরের কম বয়সী দাবাড়ুদের মধ্যে একসময় তাঁর র‍্যাংক ছিল শীর্ষে। প্রযুক্তিকে পেশা হিসেবে নেওয়ার আগে তিনি এক বিচারকের ক্লার্ক হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন। পরে তিনি ক্রেডিট সুসি গ্রুপে ট্রেডার হিসেবে কাজ শুরু করেন। ওই সময় ম্যাক্স লেভেনচিনকে নিয়ে শুরু করে পেপ্যাল নামের একটি উদ্যোগ। পরে এলন মাস্কের এক্স ডটকমের সঙ্গে যুক্ত হয় পেপ্যাল। ২০০২ সালে ইবে ১৫০ কোটি মার্কিন ডলারে পেপ্যাল কিনে নেয়। পেপ্যালের সহযোগী প্রতিষ্ঠাতারা অ্যাঞ্জেল ইনভেস্টর হিসেবে কাজ শুরু করেন। থায়েল ওই অর্থ থেকে ৫৫ মিলিয়ন ডলার পেয়েছিলেন নিজের ভাগে। ওই অর্থ দিয়ে ক্ল্যারিয়াম ক্যাপিটাল নামের হেজ ফান্ড গঠন করেন।

২০০৪ সালে মার্ক জাকারবার্গ তাঁর উদ্যোগ হিসেবে ফেসবুক শুরু করেন। পাঁচ লাখ মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করে ১০ শতাংশ মালিকানা নেন থায়েল। এর মধ্যে ৩ শতাংশ রাখেন নিজের নামে। ফেসবুকের ওটাই ছিল প্রথম বিনিয়োগ। পরে ফেসবুক যখন আইপিও ছাড়ে, থায়েল তখন তাঁর শেয়ার বিক্রি করে দেন এবং ১০০ কোটি ডলার আয় করেন।

২০০৪ সালে আরেক উদ্যোক্তা আলেকজান্ডার কার্পের সঙ্গে প্ল্যানানটির নামে একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন থায়েল। এই প্রতিষ্ঠানে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা বিনিয়োগ করে।

প্রতিষ্ঠানটি সন্ত্রাসী কার্যক্রম শনাক্ত করতে সফটওয়্যার তৈরিতে কাজ করে। ছবি, ভিডিও ও অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারে প্ল্যানানটির সফটওয়্যার। সিলিকন ভ্যালির সবচেয়ে গোপন সফল প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচয় দাঁড়িয়ে গেছে থায়েলের ওই প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির মূল্য ২০ বিলিয়ন ডলারের বেশি হলেও পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে এটি আনতে চান না তিনি।

ছোটবেলা থেকে থায়েল মা-বাবা তাঁকে টিভি দেখতে দিতেন না। তবে তিনি জে আর আর টলকিনের লেখা ‘দ্য লর্ড অব দ্য রিংস’ বই পড়তে ভালোবাসতেন। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামকরণে ওই বইয়ের বিভিন্ন বিষয়ের অনুপ্রেরণা দেখা যায়।

এখন থায়েলের বড় পরিচয় ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্ট হিসেবে। তাঁর প্রতিষ্ঠান ফাউন্ডার্স ফান্ড সম্পর্কে তিনি একবার বলেছিলেন, ‘আমরা উড়ুক্কু গাড়ি চাই, তাই পরিবর্তে পেলাম ১৪০ অক্ষর।’ উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান নিয়ে ভালো ধারণা উঠে না আসায় আক্ষেপ তাঁর। অবশ্য বর্তমানে ৮০টিরও বেশি প্রতিষ্ঠানে তাঁর বিনিয়োগ রয়েছে।

থায়েল সবচেয়ে বড় যে সমস্যাটির সমাধান করতে কাজ করছেন, তা হচ্ছে মৃত্যুকে ঠেকানো। বয়স বাড়ার প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করার বিষয়ে কাজ করছেন তিনি। থায়েল বলেন, তিনি ১২০ বছর বাঁচার পরিকল্পনা করছেন। এ জন্য তিনি প্রতিদিন মানুষ বেড়ে ওঠার বিশেষ হরমোন নেন। বয়স কমানোর প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ করা মেথিউলিস ফাউন্ডেশনে তিনি ৬০ লাখ মার্কিন ডলার দান করেছেন। এ ছাড়া তিনি বয়স থামিয়ে দেওয়ার প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা এসইএনএস রিসার্চ ফাউন্ডেশনের কাজে সমর্থন করছেন। এ ধরনের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে তিনি নানা সহযোগিতা করছেন।

থায়েল মনে করেন, কলেজের পেছনে যে পরিমাণ খরচ হয়, তার তুলনায় লাভ কম। তাই স্মার্ট তরুণদের উদ্যোক্তা হতে উৎসাহ দেন তিনি। এ লক্ষ্যে থায়েল ফেলোশিপ চালু করেছেন তিনি। তরুণ উদ্যোক্তারা তাঁদের উদ্যোগ প্রতিষ্ঠার জন্য এক লাখ মার্কিন ডলারের বৃত্তি ও দুই বছরের সমর্থন পান। এ বৃত্তি পেতে গেলে ঝরে পড়া শিক্ষার্থী হিসেবে দুই বছর পার করতে হবে। এখন পর্যন্ত ২২ বছরের কম বয়সী ১০৪ জন এ বৃত্তি পেয়েছেন।