স্ট্রেস ইটিং মোকাবেলা করবেন যেভাবে

How-to-deal-with-stress-itim


আপনার বসের কাছ থেকে কোন ইমেইল পেলেন যা দেখে আপনার মেজাজ খারাপ হয়ে গেল অথবা ঘনিষ্ঠ বন্ধুর কাছ থেকে এমন আচরণ পেলেন যা আশা করেননি- এমন ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রে আপনি হয়তো রান্না ঘরে চলে যান এবং খাওয়ার কিছু খুঁজতে থাকেন এবং খান। একেই স্ট্রেস ইটিং বলে।

 
আমেরিকার সিয়াটল এর মাইন্ডফুল নিউট্রিশনের প্রতিষ্ঠাতা এবং রেজিস্টার্ড ডায়েটিশিয়ান মিন হাই অ্যালেক্স বলেন, ‘কষ্ট এড়িয়ে যাওয়া এবং এর থেকে মুক্ত হতে চাওয়া মানুষের সহজাত একটি বিষয়’।  আমরা যখন কোন মুহূর্ত থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চাই তখনই স্ট্রেস ইটিং করি, এটা এমন একটি প্রক্রিয়া যখন আমরা স্ট্রেস পরিবর্তনের জন্য চেষ্টা করি বলে মস্তিস্কের চ্যানেলগুলোকে পরিবর্তন করতে চাই। স্ট্রেস মোকাবেলা করার জন্য মানুষ কেন খাবারের দিকে ঝুকে এবং কীভাবে একে মোকাবেলা করা যায় সে বিষয়ে জেনে নিই চলুন।

স্ট্রেসে ভুগলে কেন খাদ্যের প্রতি আকৃষ্ট হয় মানুষ
আমরা যখন সমস্যার মধ্যদিয়ে যাই তখন ক্ষুধাকাতর হই। টু মাচ অন হার প্লেট সাইটের ইমোশনাল ইটিং এক্সপার্ট এবং সাইকোলজিস্ট, এসিসি, পিএইচডি ম্যালিসা ম্যাক ক্রেরি বলেন, স্ট্রেস অ্যাড্রেনাল গ্রন্থিকে সক্রিয় করে তোলে কর্টিসল নিঃসরণের জন্য, এর ফলেই ক্ষুধা বৃদ্ধি পায়। এছাড়াও স্ট্রেস ক্ষুধার হরমোন যেমন- গ্রেলিন কে বাধা দেয়, এই হরমোন ক্ষুধাকে নিয়ন্ত্রণ করে। গবেষণায় দেখা গেছে যে, যদি উদ্বিগ্নতার কারণে আপনার ঘুমের ব্যঘাত হয় তাহলেও ক্ষুধা  বৃদ্ধি পেতে পারে। 

গবেষণায় দেখা গেছে যে, ‘স্ট্রেসে থাকা অবস্থায় নারীদের ক্যালরি ও ফ্যাট খুব কম পরিমাণে কমেছিলো এবং উচ্চমাত্রার চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়ার পর তাদের ইনসুলিনের প্রতিক্রিয়া অনেক  বেশি ছিল’। বায়োলজিক্যাল সাইকিয়াট্রি নামক সাময়িকীতে প্রকাশিত হয় এই গবেষণা প্রতিবেদনটি। গবেষণার উপসংহারে বলা হয় যে, স্ট্রেসে থাকলে নারীর দৈনিক মাত্র ১০০ ক্যালরি পোড়ে যার কারণে বছরে তাদের ১১ পাউন্ড ওজন বৃদ্ধি পায়। 

স্ট্রেসের মধ্যে থাকলে নিয়ন্ত্রণহীন ও বিহবল অনুভব করেন আপনি এবং এর প্রভাব খাওয়ার অভ্যাসের উপরও পরে। ম্যাক ক্রেরি বলেন, আপনার স্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাস ছেড়ে আপনি যখন জাংক ফুড খাওয়া শুরু করেন ক্ষুধার্ত সিংহের মত তখন অবাক হওয়ার কিছু নেই। তিনি বলেন, ‘আপনি  অতীত বা ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত থাকেন বলেই বর্তমানে কী খাচ্ছেন তা নিয়ে চিন্তা করেন না’। 

‘আপনার প্রাণবন্ত ও ফোকাস থাকার জন্য যে জ্ঞানীয় সম্পদ প্রয়োজন তা এবং সমস্যা  সমাধানের সৃজনশীল অনুশীলনের ক্ষমতা কমিয়ে দেয় স্ট্রেস বা মানসিক চাপ’ – বলেন  ম্যাক ক্রেরি।

যখন জাংক ফুড আপনাকে ডাকতে থাকে
‘উত্তেজনার মুহূর্তে আপনি শশা বা গাজর খান না, এটা জীববিদ্যার বিপরীত ঘটনা। ফ্রাই, কুকিজ এবং আইসক্রিমে উচ্চমাত্রার কার্বোহাইড্রেট ও ফ্যাট থাকে বলে মস্তিস্কে ডোপামিনের প্রতিক্রিয়াকে বৃদ্ধি করে বলে ভালো অনুভব করেন’ অ্যালেক্স ব্যাখ্যা করে বলেন। পরবর্তীতে আপনি এর মাঝেই আটকে যান, আপনি তখন চকলেট চিপসের প্রতি প্রবল আকাঙ্ক্ষা অনুভব করেন  কারণ আপনার মস্তিস্ক ডোপামিনের জন্য পুরষ্কার আসা করে এবং জানে যে কোথায় পাওয়া যাবে। 

শুধু তাই নয়, এর ফলে স্ট্রেস স্ন্যাক্স  গ্রহণের বদ্ধমূল অভ্যাসে পরিণত হয়। ২০১৫ সালের এক গবেষণা যা প্রকাশিত হয় দ্যা জার্নাল অফ ক্লিনিক্যাল এন্ডোক্রাইনোলজি এন্ড মেটাবোলিজম এ প্রকাশ করা হয় যে, আমরা উচ্চ মাত্রার চিনি জাতীয় খাবার খাই কারণ চিনি স্ট্রেসের কারণে সৃষ্ট কর্টিসলের প্রতিক্রিয়াকে নিষ্ক্রিয় করতে পারে। 

স্ট্রেস ইটিং বন্ধ করার উপায়

১। আসল সমস্যার প্রতি ফোকাস করুন
আমরা সবাই জানি যে মানসিক চাপের সময় খাদ্য সহায়ক ভূমিকা পালন করে। অ্যালেক্স বলেন, ‘স্ট্রেস ইটিং প্রাথমিক সমস্যা নয় কিন্তু অপূর্ণ চাহিদার উপসর্গ মাত্র’। সঠিক কারণটি জানার জন্য নিজেকে জিজ্ঞেস করুন, আমি কেমন অনুভব করছি? অথবা আমার কী প্রয়োজন?  

২। দীর্ঘমেয়াদী চিন্তা
২০১৪ সালের এক গবেষণায় বলা হয় যে, স্ট্রেস ইটিং শুরু করার পূর্বে ভবিষ্যতের দিকে ফোকাস করুন ১ মিনিটের জন্য। অর্থাৎ আপনার ওজন নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যের কথা মনে করুন। এই মুহূর্তটিই আপনাকে মুখরোচক খাবারের পরিবর্তে স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার প্রতি আকৃষ্ট করবে। 

৩। মনোযোগী হোন
ওবেসিটি নামক সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণা প্রতিবেদনে জানা যায় যে, যে নারীরা স্ট্রেস কমানোর কৌশল শেখেন - কিভাবে ক্ষুধাকে চিহ্নিত করবেন এবং স্বাদের উপর মনোযোগ দেবেন, তাদের স্ট্রেস ইটিং এর অভ্যাস কমে এবং তাদের কোমরের মেদ ও কমে নিয়ন্ত্রিত গ্রুপ এর তুলনায়। আপনার নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের প্রতি মনোযোগ দিলে স্ন্যাক্স খাওয়ার প্রতি স্বয়ংক্রিয় যে আকাঙ্ক্ষা অনুভব করেন তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারবেন।

৪। নিজের প্রতি সদয় হোন
অ্যালেক্স বলেন নিজের প্রতি সমব্যথী হলে স্ট্রেস ইটিং কমবে। আপনি যদি স্ট্রেস ইটিং করেই ফেলেন তাহলে নিজেকে এর জন্য দোষারোপ করার প্রয়োজন নেই, প্রতিটা মানুষেরই এরকম হতে পারে কখনো কখনো।

৫। সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে
যদি এ সব কিছুই ব্যর্থ হয় তাহলে নিজের ইচ্ছা পূরণ করুন। ম্যাক ক্রেরি বলেন, ‘খাদ্য খুবই চমৎকার এবং স্বস্তিদায়ক একটি জিনিস’। তাই একে উপভোগ করার পরামর্শ দেন তিনি। বসুন, শিথিল হোন এবং আইসক্রিমের স্বাদ নিন। তবে অবশ্যই পরিমিত পরিমাণে।

স্ট্রেস ইটিং মোকাবেলা করবেন যেভাবে আপনার বসের কাছ থেকে কোন ইমেইল পেলেন যা দেখে আপনার মেজাজ খারাপ হয়ে গেল অথবা ঘনিষ্ঠ বন্ধুর কাছ থেকে এমন আচরণ পেলেন যা আশা করেননি- এমন ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রে আপনি হয়তো রান্না ঘরে চলে যান এবং খাওয়ার কিছু খুঁজতে থাকেন এবং খান। একেই স্ট্রেস ইটিং বলে।