ফ্রিল্যান্স আইটি ট্যালেন্ট গড়ছে কোডার্সট্রাস্ট

Freelance-IT-Talent-building-kodarsatrasta 


 শিখবো সবাই’ এটাই কোডার্সট্রাস্টের ট্যাগলাইন। যখন যেখানে.. সেখান থেকেই আয় করা সম্ভব কোডার্স ট্রাস্টে। আর শিখতে শিখতে সে আয়। শিক্ষার্থীরা শিখবে… আয়ও করবে এমনটাই কোডার্সট্রাস্টের কর্মপন্থা।


বড় পরিবর্তন আনতে উদ্বুদ্ধকরণটাই বড় কাজ। এখানে আমরা প্রধানত সে কাজটিই করি । কোডার্স ট্রাস্টে শিক্ষার্থীদের উদ্বুদ্ধ করে তোলা হয়। তবে তা কেবলই যে অর্থ আয়ের জন্য, তা নয়… এর মধ্য দিয়ে তাদের সামাজিক মূল্যবোধের সক্ষমতা বাড়ে, নেতৃত্বের উন্নয়ন ঘটে আর সর্বোপরি আস্থা তৈরি হয়। আস্থা বা বিশ্বাস স্থাপনের বিষয়টি আমাদের নামেই রয়েছে। সুতরাং আস্থা তৈরি ও আস্থা অর্জন এই দুইই আমাদের লক্ষ্য।’

বেশ আস্থার সঙ্গেই এসব কথা বলছিলেন জ্যান-কায়ো ফিবিগ।

কোডার্সট্রাস্টের কো-ফাউন্ডার ও সিওও এই জ্যান-কায়ো ফিবিগ। তার সঙ্গে বাংলানিউজের কথা হচ্ছিলো প্রতিষ্ঠানটির ঢাকা অফিস ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে বসে। রাজধানীর গুলশানের এই কার্যালয়ে কোডার্সট্রাস্টের প্রশিক্ষণকেন্দ্রটি ঘুরে দেখা গেলো কোথাও শিক্ষার্থীদের ক্লাস চলছে, কোথাও চলছে আড্ডা, কোথাও কাজে মগ্ন কেউ কেউ। সব মিলিয়ে এক জমজমাট পরিবেশ।

‘এখানে সবাই কাজ শেখে… কাজ করে… আর আয় করে, তিনটাই একসঙ্গে চলে, আর যখন তারা আয় করে আর শেখে, তখন তাদের মধ্যে একধরনের আস্থা তৈরি হয়,’ বললেন জ্যান-কায়ো ফিবিগ।

কোডার্সট্রাস্টের একটি ক্লাসরুম

এ পদ্ধতির মধ্য দিয়ে আমরা অনেকের স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করে চলেছি। গত তিন বছরেরও কম সময়ে আমরা অন্তত ১৪৪০ জন শিক্ষার্থীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছি, বলেন তিনি।

তথ্য প্রযুক্তির জগতে শেখার কোনও শেষ নেই, সুতরা একবার শিক্ষার্থী হিসেবে ঢুকে পড়া মানেই হচ্ছে আজীবনের ছাত্র। আর কোডার্সট্রাস্টে আমরা সারাক্ষণই শেখাতে প্রস্তুত। সুতরাং একবার যে এখানে শিক্ষার্থী হিসেবে ঢুকে পড়ে তার জন্য এখানকার দরজা সবসময়ের জন্য খোলা হয়ে যায়। তথ্য প্রযুক্তি জগতের নতুন নতুন অগ্রগতিগুলোও তারা সহজেই জানতে পারে, বলছিলেন আতাউল গনি ওসমানি।

আতাউল গনি কোডার্সট্রাস্টের ঢাকা অফিসের কান্ট্রি ডিরেক্টর। বাংলানিউজের সঙ্গে আলোচনায় তিনিও অংশ নিয়েছিলেন।

২০১৭ সালের মধ্যে সারাদেশে ১০ হাজার জনের ফ্রিল্যান্সার কমিউনিটি গড়াই কোডার্সট্রাস্ট বাংলাদেশ’র লক্ষ্য। আর এই লক্ষ্য পূরণে অফলাইন ও অনলাইন উভয় পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, জানালেন তিনি।

এখানে শিক্ষার্থীরা মেন্টরদের সামনে ক্লাসরুমে বসে যেমন প্রশিক্ষণ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন, তেমনি অনলাইনে আন্তর্জাতিক মেন্টরদের ক্লাসে অংশ নিতে পারছেন। আর একবার আপনি কোডার্সট্রাস্টের সঙ্গে সংযুক্ত হলে, যে কোনও স্থান থেকে যে কোনও সময়ে আপনি শিখতে ও আয় করতে পারবেন, বলেন জ্যান-কায়ো ফিবিগ।

কোডার্সট্রাস্টে যেখানে শেখা সেখানেই কাজ ও আয়ের ব্যবস্থা

ডেনমার্কের এই যুব শুভেচ্ছা দূত কোডার্সট্রাস্টের পতাকা হাতে বাংলাদেশেই অবস্থান করছেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশকে এই আইটি নেশনে পরিণত করার সকল সম্ভাবনা রয়েছে। এখানে তরুণ ও যুবাশ্রেণি বেশ উদ্যমী। তাদের কর্মস্পৃহা প্রবল। তাদের অন্যতম যা প্রয়োজন তা হচ্ছে উদ্বুদ্ধ করা ও সঠিক পথটি বাতলে দেওয়া। কোডার্সট্রাস্টে আমরা সে কাজটিই করি।

পরবর্তী প্রজন্মকে ফ্রিল্যান্স আইটি ট্যালেন্ট হিসেবে গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য, বলেন তিনি।

তবে কোডার্স ট্রাস্ট প্রযুক্তি বিষয়ক কোম্পানির চেয়েও বড় কিছু ভাবতে চান প্রতিষ্ঠানটির এই কো-ফাউন্ডার। তিনি বলেন, আমরা শিক্ষার্থীদের সৃষ্টিশীল, উদ্ভাবনী শক্তির নির্মাতা হিসেবে যেমন গড়ে তুলি, তেমনি আজকের যে শিক্ষার্থী কাল তাকেই শিক্ষক হিসেবে গড়ে ওঠার সুযোগ করে দেই। বিশ্বের ২২টি দেশে কোডার্স ট্রাস্ট এভাবেই কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

কোডার্স ট্রাস্টের ওয়েব সাইটে জানানো হয়েছে, এটি মূলত ফার্দিনান্দ জারাল্ফ নামে ডেনমার্কের সাবেক একজন সেনা কর্মকর্তার মস্তিষ্কজাত। তিনিই কোডার্স ট্রাস্ট’র প্রতিষ্ঠাতা। ইরাকযুদ্ধের সময় সেখানেই নিযুক্ত ছিলেন জারাল্ফ। তিনি তখন কর্মস্থলে স্থানীয় নাগরিকদের ই-লার্নিং নিতে কাজ করতেন। সেটি ছিলো অত্যন্ত সফল এক কর্মসূচি। আর তাতেই উদ্বুদ্ধ হয়ে ড্যানিডার সহায়তায় কোডার্স ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠা করলেন। বিশ্ব পরিমণ্ডলে ইন্টারনেটের মাধ্যমে শিক্ষার গণতান্ত্রিক সুযোগ সৃষ্টিই ছিল এর লক্ষ্য।

কোডার্স ট্রাস্টে কি শেখা যায়? সে প্রশ্নে জানালেন- এখানে ওয়েব ডিজাইন, গ্রাফিক ডিজাইন, অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম, এসইও অ্যান্ড এসএমএম, ওয়ার্ডপ্রেস ডেভেলপমেন্ট উইথ ই-কমার্স এবং অ্যন্ড্রয়েড অ্যাপস ডেপেলপমেন্ট কোর্সগুলো রয়েছে। তিন থেকে পাঁচ মাসের এই প্রতিটি কোর্সেই অফলাইন ও অনলাইন উভয় পদ্ধতিতে ক্লাস নেওয়া হয়। আর প্রতিটি কোর্সের সঙ্গেই রয়েছে ফ্রিল্যান্সিং। এতে শিক্ষার্থীরা শিখতে শিখতে কাজ করে আর আয় করে। আর কোর্স শেষ হলে তাদের বিশেষ মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে সনদপত্রও দেওয়া হয়।

ভার্চুয়াল বাজারে একটি কাজ পেতে অনেকের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামতে হয়। এই প্রতিযোগিতা হয় বিশ্বমানের। সুতরাং বিশ্বমানের দক্ষতা নিয়েই তাতে অংশ নিতে হয়। এখানে সবচেয়ে বড় বিষয় যোগাযোগ দক্ষতা। আপনি আপনার দক্ষতা দিয়ে ক্লায়েন্টকে কতটা খুশি করতে পারলেন, কতটা আস্থা অর্জন করতে পারলেন সেটিই এখানে প্রধান ধর্তব্য।

জ্যান-কায়ো বলেন, এখানে প্রধানতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে, বাজারটাকে জেনে নেওয়া। কোডার্স ট্রাস্টে আমরা শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই দক্ষতা ও জ্ঞান বাড়ানোর কাজে সহায়তা দিচ্ছি।

আমরা তাদের এই জগতের সবশেষ অগ্রগতি বিষয়ে যেমন ধারনা দেই তেমনি সঠিক ও সহজ যোগাযোগের ইংরেজিতে দক্ষ করে তুলতেও ভূমিকা রাখি, যোগ করেন আতাউল গনি।

কায়ো বলেন, লাইভ ক্লাসগুলোতে আন্তর্জাতিক মান আনতে আমরা বিশ্বখ্যাত মেন্টরদের নিয়ে আসি। অনলাইনভিত্তিক এই সেশনগুলোতে যে কেউ যে কোনও স্থান থেকে অংশ নিতে পারে। স্রেফ ইন্টারনেট কানেকশন থাকাটাই যথেষ্ট।

অন্য সুবিধাগুলোর মধ্যে সপ্তাহে সাত দিন, চব্বিশ ঘণ্টা অনলাইন সাপোর্ট, ক্যারিয়ার অ্যাডভাইজর সাপোর্ট, ইংরেজি যোগাযোগ দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ পান শিক্ষার্থীরা।

জ্ঞান অর্জন আর তা ভাগাভাগি করে নেওয়াতেই আমাদের বিশ্বাস। কেউ একজন কিছু জানলে তা অন্যদেরও জানাবে এটাই সকলের শিক্ষা। শিখবো সবাই… এটাই আমাদের ট্যাগলাইন। সার্বিকভাবে একটি আইটি জ্ঞানসম্মৃদ্ধ জাতি গড়ে তুলতে এই পদ্ধতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, মত জ্যান-কায়োর।

‘সে হাই টু ইওর নিউ ফ্রেইন্ডস’ নামে কোডার্সট্রাস্টের ওয়েবসাইটে একটি চ্যাটবক্সও রয়েছে। যাতে সারাক্ষণই বার্তা, তথ্য ও জ্ঞান চালাচালি দেখা যায়।

কোডার্সট্রাস্টের আরেকটি প্রধান লক্ষ্য মেয়েদের আইটি খাতে বেশি বেশি উদ্বুদ্ধ করা। জ্যান কায়ো বলেন, সার্বিকভাবে মেয়েরা এই খাতে এখনো পিছিয়ে। কিন্তু জাতির উন্নয়ন ঘটাতে হলে একটি অংশের এই পিছিয়ে থাকা চলবে না। এ কারণে কোডার্সট্রাস্ট মেয়েদের উদ্বুদ্ধ করতে নানা কর্মসূচি নিচ্ছে। ন্যাশনাল হ্যাকথন ফর উইমেন ২০১৭ কর্মসূচিতে অন্যতম পৃষ্ঠপোষক হিসেবেও কাজ করেছে কোডার্সট্রাস্ট।

মেয়েদের ঘরের বাইরে কাজ করা একটি সমস্যা হিসেবে দেখা হয়। যদি তাই হয়, তাদের জন্য ঘরে বসেই আয় করা সম্ভব এই আইটি খাতে। আর কোডার্সট্রাস্ট সেক্ষেত্রে বড় সহায়ক হতে পারে, বলেন আতাউল গনি ওসমানি।

কোডার্স ট্রাস্টের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বাংলাদেশি আইসিটি বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ী আজিজ আহমদের সঙ্গেও এ নিয়ে কথা হয় বাংলানিউজের। তিনি বলেন, কোডার্সট্রাস্ট স্রেফ কোনও ব্যবসায়ী উদ্যোগ নয়, এই উদ্যোগ সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলার স্বপ্নপূরণেও অন্যতম সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করছে। 

শিখবো সবাই’ এটাই কোডার্সট্রাস্টের ট্যাগলাইন। যখন যেখানে.. সেখান থেকেই আয় করা সম্ভব কোডার্স ট্রাস্টে। আর শিখতে শিখতে সে আয়। শিক্ষার্থীরা শিখবে… আয়ও করবে এমনটাই কোডার্সট্রাস্টের কর্মপন্থা।