বোকা মেয়ের ডায়রি: একুশের সেক্স অ্যাপিল ও দুটি অশ্লীল সত্য ঘটনা

Stupid-girl-Diary-Twenty-Sex-Appeal-and-the-two-big-facts

 নেশায় কথা সাহিত্যিক, পেশায় সাংবাদিক। "বোকা মেয়ের ডায়রি" শিরোনামে একটি নিয়মিত ব্লগ লেখেন প্রিয়.কমের পাতায়। আজ প্রকাশিত হলো বোকা মেয়ের ডায়রির একটি বিশেষ পর্ব। 


কদিন আগেই চোখে পড়লো এক অতি মজার জিনিস। আমাদের সময় নামক এক দৈনিক পত্রিকায় ছাপা হয়েছে "একুশের রান্না"! আমি অনেকক্ষণ ব্যাপারটির দিকে তাকিয়ে রইলাম, বুঝতে চেষ্টা করলাম যে রন্ধনশিল্পী মূলত একুশের খাবার-দাবার নাম দিয়ে কী পরিবেশন করতে চাইছেন। ভদ্রমহিলার নাম আমি আগে কখনো শুনিনি, সেদিনই প্রথম। এবং বলাই বাহুল্য যে প্রথম অভিজ্ঞতা মোটেও সুখকর ছিল না! যাই হোক, খাবারের আয়োজনে কী কী ছিল বলি-

একটা কেক, যাতে কিনা সাদা ক্রিমের ওপরে স্থানে স্থানে রক্তের ছোপ ছোপ দেয়া। দুটি চোখ আছে, সেগুলো দিয়ে রক্ত বিন্দু ঝরছে! সব মিলিয়ে অতি ভয়াবহ অবস্থা। রক্তের ছোপ ছোপ দেয়া কিংবা কান্নারত দুটি চোখের ছবি দেয়া কেক মানুষ কীভাবে কেটে খাবে বা কীভাবে রুচিতে কুলাবে, সেটা আমার কাছে বিরাট প্রশ্ন হয়ে রইলো। আয়োজনে আরও ছিল ভুনা খিচুড়ি, ইলিশের একটা রান্না এবং সুইস রোল। কেক এবং সুইস রোল যে বাঙালি খাবার, সেটাও আমি ওই পত্রিকা থেকেই প্রথম জানতে পারলাম! আমি বিগত কয়েকমাসে এই খাবারগুলোর চাইতে রুচিহীন আর কিছু দেখেছি বলে মনে পড়ছে না!
অবশ্য, এদেরকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। আজকাল আমাদের দেশে সবকিছুই উৎসব। বলা ভালো যে ডেটিং করার বা সেলফি দেয়ার, বিভিন্ন স্থানে চেক ইন দেয়ার একটা বাহানা কেবল! এমনকি, লোকজন নাকি আজকাল বই মেলাতেও যায় চেকিং আর সেলফি দিতে, বই কেনে না কিছুই। এদের অত্যাচারে বরং আসল পাঠকেরাই অস্থির! এই চেক ইন আর সেলফি তোলা জাতির জন্য একুশে ফেব্রুয়ারিও যে একটা উৎসব বিশেষ, সেটা মোটেও বলার অপেক্ষা রাখে না। বেশ কয়েক বছর ধরেই একুশের সাজ নামে কিছু জিনিস পত্রিকায় ফ্যাশন পাতাগুলোয় দেখতে পাওয়া যায়।বিগত বছরগুলোতে দেখা যেতো বিভিন্ন ফ্যাশন হাউজের বর্ণমালা লেখা শাড়ি-জামা কিংবা বাচ্চাদের জন্য পোশাক। বেশ রুচিশীল ভাবে পরা, বেশ রুচিশীল ভাবে লেখাও। যদিও একুশে ফেব্রুয়ারি যে নতুন পোশাক পরে আনন্দ করার দিন না, দিনটি আন্তজার্তিক মাতৃভাষা দিবস হলেও ইতিহাসের কারণেই যে বিনম্র শ্রদ্ধার সাথে পালন করা উচিত- সেটা এই দেশের বেশীরভাগ মানুষের মাথায় কখনোই ঢোকেনি। অন্যান্য সকল দিবসের মত এটাও খুব আনন্দের একটা দিবস এই দেশে। রাঁধুনিরা রান্নার রেসিপি দেয়, ফ্যাশন হাউজগুলো নতুন কালেকশন আনে, ফোন আর ইন্টারনেট কোম্পানি নতুন অফার আনে, মানুষজন সেজেগুজে বেড়াতে যায় আর সেলফি তোলে, পত্রিকায় ছাপা হয় একুশের সাজসজ্জা বিষয়ক পরামর্শ...

অবশ্য আজকাল যা দেখতে পাই সেগুলোকে সাজ বলার চাইতে বরং একুশের যৌন আবেদন বলাই ভালো। ২/১ বছর আগেই একটি পত্রিকা "একুশের সাজ" নামে একটি আয়োজন করে বেশ বিতর্কিত হয়েছিল (ছবিটি প্রচ্ছদের দেখতে পাবেন)। তবে পরিস্থিতির যে পরিবর্তন হয়েছে, সেটা কিন্তু নয়। কালই দেখলাম অত্যন্ত স্বনামধন্য এক নায়িকা "একুশের পোশাক" পরিধান করে মারাত্মক যৌন উত্তেজক ভঙ্গিতে পোজ দিয়েছেন। একুশের পোশাক ও ভাবগাম্ভীর্য কেমন হওয়া উচিত সেটার একটা জ্বলন্ত উদাহরণই বটে! অবশ্য আমরা সেই জাতি, যাদেরকে বারবার অনুরোধ করতে হয় জুতো পায়ে শহীদ মিনারে না ওঠার জন্য। আমাদের কাছ থেকে তো যৌন উত্তেজক ভঙ্গিতে একুশের সাজ, অশ্রুঝরা চোখের ছবি দেয়া কেক, শহীদ মিনারে দাঁড়িয়ে সেলফি ইত্যাদির বাইরে আর বেশি কিছু আশা করা যায় না। তাই না?

এবং দুটি অশ্লীল সত্য ঘটনা-
আজ আমার আম্মুর জন্মদিন (যদিও একুশে ফেব্রুয়ারিকে শ্রদ্ধা জানিয়ে সেটা আমরা আগামীকাল পালন করবো)। মায়ের জন্য শুভেচ্ছা উপহার কিছু কেনা যায় কিনা ভেবে একটি নামকরা ফ্যাশন হাউজে ঢুকেছি। বলাই বাহুল্য যে সেখানে অনেক রকমের "নতুন কালেকশন" আছে! দুটি মেয়ে শপিং করছেন। মেয়ে মানে কিশোরী নন, ২৭/২৮ বছরের তরুণী। গলায় অফিসের আইডি কার্ড ঝোলানো। তাঁদের কথোপকথন যেটুকু শুনতে পেয়েছি, তুলে দিলাম এখানে। বাকিটা পাঠকের বিবেচনা-

-"ওই শাড়িটা পরবি না কেন, সমস্যা কী? ব্লাউজ বানায় ফেলসিস না?"
-"শাড়িটা বেশি ভারী। অনেক মোটা। ছবিতে আমাকে মোটা মনে হবে।"
-"এখন তো নতুন ব্লাউজ বানানোর টাইম নাই!"
-"নতুন বানাবো না, ওই ব্লাউজের সাথে ম্যাচিং করে একটা শাড়ি নিয়ে নিব। কালকে ওর সাথে আমার প্রথম একুশে ফেব্রুয়ারি। আই হ্যাভ টু লুক হট!'
এই পর্যায়ে আমি একটু ভিরমি খেলাম।প্রেমিক বা স্বামীর সাথে প্রথম একুশে ফেব্রুয়ারি ভালো কথা, কিন্তু হট দেখাতে হবে কেন???
-"তাহলে অন্য রঙের শাড়ি নিতি। কালো আর সাদাতে বুড়ি বুড়ি লাগে।"
-"ধুর, সাদা-কালোই একুশে ফেব্রুয়ারির ট্রেন্ড, সবাই পরবে। তুই আমাকে ভালো দেখে একটা শাড়ি বেছে দে। পাতলা দেখে। সি থ্রু শাড়িতে আমাকে স্লিম লাগে।"
-"এদের কাছে মনে হয় পাতলা শাড়ি নাই, অন্য কোথাও যাবি?"
-"চল। নেইল পলিশও কেনা হয় নাই। একটা ক্রিমসন রেড কালারের লিপস্টিক লাগবে, ওর সব ফ্রেন্ডরা কালকে দেখবে আমাকে...পারফেক্ট লুক না হলে ও খুব মাইন্ড করবে।প্রেস্টিজ ইস্যু!"

জানিনা কেন, দোকানের মাঝে দাঁড়িয়েই আমার কেমন বমি বমি পাচ্ছিল! আমাদের মেয়েরা কি আজীবনই এমন নির্বোধ ছিল, নাকি এরা নতুন সংস্করণ? সে সাহসী, দুর্বিনীত, শিক্ষিত, রুচিশীল বাঙালি নারীরা কোথায়? আমাদের মা, খালা, বড় বোনদের যেমন দেখেছি... সেই দারুণ বাঙালি মেয়েরা কোথায়? আজকালকার বাঙালি নারীরা কেন সানি লিওন সাজতে না পেরে বিমর্ষ হয়, একুশে ফেব্রুয়ারির ভাবগাম্ভীর্যের নামে যৌন উত্তেজক পোজ দেয় আর পত্রিকার পাতায় একুশের রেসিপি ছাপে? কেন?!!!

উত্তর মিলল না, কিন্তু রাতের বেলা দেখলাম আরও একটি আঘাত লাগার মত বিষয়। ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে গিয়েছে একটি ভিডিও, সেটি। ভদ্রমহিলাকে আজ পর্যন্ত আমি খুবই পছন্দ করতাম, সঙ্গত কারণেই নামটি বলছি না। একজন নামকরা অভিনেত্রী, ক্যামেরার সামনে শহীদ মিনারে জুতো নিয়ে ওঠা বিষয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন। পারিবারিক শিক্ষা নেই বলেই এমন হচ্ছে মন্তব্য তাঁর। খানিক বাদেই দেখা গেলো তিনি নিজেই জুতো পায়ে শীদ মিনারে হাঁটাহাঁটি করছেন! জানি না কেন, আমি ভীষণ অপমানিত বোধ করতে শুরু করলাম। অপমানে, লজ্জায় নীল হয়ে যেতে থাকলাম।

কোন একটা অজ্ঞাত কারণে, একুশে ফেব্রুয়ারিকে ঘিরে যত নির্বুদ্ধিতা ও কুৎসিত ব্যাপার চোখে পড়েছে, সবগুলোর সাথেই নারীরা জড়িত। আঁচল একদিকে সরিয়ে যৌন উত্তেজক পোজ হোক, রেসিপি দেয়া হোক বা ক্যামেরার সামনে জ্ঞানের কথা বলে নিজেই সেই অসভ্য আচরণ করা... যা চোখে পড়েছে সবই নারীকেন্দ্রিক। এই লেখাটি লিখতে লিখতে আমি নিউজফিডে আমজনতার সেলফি দেখছি। চড়া মেকআপ নিয়ে প্রেমিক প্রেমিকার হাত ধরে বেড়াতে যাওয়ার সেলফি তো আছেই, শহীদ মিনারে দাঁড়িয়ে ফুল হাতে ধরা সেলফিও দেখলাম এক ছেলে ও তার প্রেমিকার। সাথে লেখা- "গাইজ, আমরা চলে এসেছি। একটু পরই ফুল দিতে যাচ্ছি। রেসপেক্ট!" প্রেমিকার হাতে ফুল, প্রেমিক ভি সাইন দেখাচ্ছে।

বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসাবে আমি কুৎসিত রকমের লজ্জিত বোধ করছি। আমাদের রাষ্ট্রভাষাটি মনে হয় উর্দু হওয়াই উচিত ছিল। তাহলে হয়তো এত খারাপ লাগতো না...

পরিশিষ্ট-
লেখার শেষে একটু আত্মবিজ্ঞাপন করি। একুশে গ্রন্থমেলায় এই অধমের তিনটি বই প্রকাশিত হয়েছে এবার।

অবলৌকিক- বিদ্যা প্রকাশ (স্টল নং ৩৭০-৩৭১-৩৭২)
প্রিয় সম্পর্ক- জাগৃতি প্রকাশনী (স্টল নং ১৫৮-১৫৯-১৬০)
পুনঃশায়াতিন- জাগৃতি প্রকাশনী (স্টল নং ১৫৮-১৫৯-১৬০)


এবং একটি বিনীত অনুরোধ-
কেবল সেলফি তোলার জন্য বইমেলায় যাবেন না, প্লিজ। এতে পাঠক ও লেখক হিসাবে আমরা অপমানিত বোধ করি। কেবল বইয়ের সাথে সেলফি তুললেই জ্ঞানী হওয়া যায় না, জ্ঞানী হবার জন্য বই পড়তে হয়!

নেশায় কথা সাহিত্যিক, পেশায় সাংবাদিক। "বোকা মেয়ের ডায়রি" শিরোনামে একটি নিয়মিত ব্লগ লেখেন প্রিয়.কমের পাতায়। আজ প্রকাশিত হলো বোকা মেয়ের ডায়রির একটি বিশেষ পর্ব।