অকেজো কম্পিউটার-মোবাইলফোনের গন্তব্য কোথায়?

Where-is-the-destination-computer-functioning-mobile-phone 



দেশে অকেজো-নষ্ট কম্পিউটার, মোবাইলফোন রিসাইক্লিং করা হয় না। ফেলে দেওয়া হয় যেখানেসেখানে। তবে কিছু-কিছু অকেজো-নষ্ট কম্পিউটার ব্যক্তিগত উদ্যোগে সংগ্রহ করা হয় নতুন করে ব্যবহার করার জন্য। অর্থাৎ নষ্ট কম্পিউটারের মধ্যে যেটুকু ভালো অংশ (যন্ত্রাংশ) আছে, তা সংগ্রহ করে অবশিষ্টাংশ ফেলে দেওয়া হয়। কিন্তু এসব ই-বর্জ্য কোথায় যায়, সে বিষয়ে কারও কাছে কোনও তথ্য নেই। কেউ জানেও না।


জানা গেছে, একটি মোবাইলফোন বা কম্পিউটারের গড় আয়ু ৩ থেকে ৫ বছর। মোবাইলফোনের  বেলায় কখনও কখনও তা আরও কম। তাহলে দেশে ৩ বা ৫ বছর বা তারও আগে যেসব কম্পিউটার বা মোবাইল ঢুকেছিল, সেগুলোর কী অবস্থা? কম্পিউটার ব্যবসায়ীরা নিজেরাও জানেন না নষ্ট বা পুরনো কম্পিউটার, মোবাইলফোন কোথায় যাচ্ছে। উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলোর বাংলাদেশ অফিসের কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা নাম-পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, দেশে নষ্ট বা পুরনো কম্পিউটার রি-সাইক্লিংয়ের ব্যাপারে তাদের কোনও উদ্যোগ নেই।

জানা গেছে, প্রযুক্তি পণ্যের বাজার প্রসার কার্যক্রমে পণ্য উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলো এমডিএফ (মার্কেট ডেভেলপমেন্ট ফান্ড) তথা বাজার উন্নয়ন বিষয়ক তহবিল দিলেও নষ্ট বা পুরনো কম্পিউটার রিসাইক্লিং বা ডাম্পিংয়ের জন্য কোনও বরাদ্দ দেওয়া বা তহবিল গঠনের কোনও পরিকল্পনা নেই।    

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আশির দশকের পর থেকে দেশে বাণিজ্যিকভিত্তিতে কম্পিউটার আসা শুরু হলেও আজ পর্যন্ত পুরনো কম্পিউটার রিসাইক্লিংয়ের কোনও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। সরকার বা কম্পিউটার ব্যবসায়ীদের এ ধরনের কোনও উদ্যোগ গ্রহণ করতেও দেখা যায়নি। অথচ ক্ষতি যা হওয়ার এরই মধ্যে হয়ে গেছে বলে সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা। তাদের দাবি, এখনই এ বিষয়ে কোনও উদ্যোগ গ্রহণ করা না হলে আগামীতে ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখে দাঁড়াতে হবে আমাদের। 

গত বছরের শেষ দিকে সরকারের আইসিটি বিভাগের উদ্যোগে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ে একটি উদ্যোগের কথা শোনা গিয়েছিল। গত ২২ সেপ্টেম্বর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছিলেন, ‘‘আমরা ‘ই-ওয়াস্ট ম্যানেজমেন্ট ও রিসাইক্লিং প্ল্যান্ট’ তৈরির বিষয়ে একটি সভা করেছি। প্রস্তাবনাও তৈরি করেছি। এরসঙ্গে জড়িত সব পক্ষের সঙ্গে বসে তা চূড়ান্ত করা হবে।’ তিনি আরও বলেছিলেন, এ বিষয়ে আমরা জাপান, চীন, কোরিয়াকে অনুসরণ করে বেস্ট প্র্যাকটিসগুলো করব। কিন্তু এ বিষয়ে পরবর্তী সময়ে আর কোনও পদক্ষেপের কথা শোনা যায়নি। সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের মধ্যে অন্যতম অংশীদার তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবসায়ীরাও রয়েছেন অন্ধকারে। তারা সরকারের এ ধরনের কোনও উদ্যোগের কথা এখনও জানেন না বলে জানিয়েছেন।

বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির (বিসিএস) সভাপতি আলী আশফাক জানান, এ ধরনের কোনও উদ্যোগের কথা তার জানা নেই। তিনি মনে করেন, এ কাজের জন্য সরকারের প্রচেষ্টা গ্রহণ করা উচিত। তিনি বলেন, প্রাইভেটভাবেও এটা করা যায় কিন্তু সরকারের সাপোর্ট ছাড়া রি-সাইক্লিং প্ল্যান্ট করা মুশকিল। সরকার জায়গা দেবে, কর্মপদ্ধতি ঠিক করে দেবে,  তা না হলে আমাদের প্রযুক্তি ব্যবসায়ীদের সংগঠনের পক্ষে এ কাজ করা সম্ভব নয়।

জানা গেছে, হাইটেক পার্কগুলোতে রি-সাইক্লিং প্ল্যান্ট তৈরির প্রস্তাব দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বিসিএস-এর। সংগঠনটি সরকারের কাছ থেকে এ ধরনের কোনও প্রস্তাব পেলে পরামর্শ আকারে তা আইসিটি বিভাগের কাছে পেশ করবে।

তথ্যপ্রযুক্তি খাতে এ ধরনের কোনও পরিসংখ্যান না থাকলেও কম্পিউটার ব্যবসায়ী, বিভিন্ন প্রযুক্তি মেলার তথ্য ও সংশ্লিষ্ট খাতের বিশ্লেষকদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ২০১৫ সালে দেশে ল্যাপটপ বিক্রি হয় ৬ লাখ। সে সময় ডেস্কটপ-ল্যাপটপের অনুপাত ছিল ৭০:৩০। এই হিসেবে ডেস্কটপ বিক্রির পরিমাণ আড়াই লাখের কিছু বেশি। ২০১৬ সালেও এ খাতে প্রবৃদ্ধি ছিল। অন্যদিকে প্রতি বছরই একটা বিশাল পরিমাণ কম্পিউটার ও এর যন্ত্রাংশ নষ্ট হচ্ছে।

অন্যদিকে ২০১৬ সালে দেশে মোবাইলফোন প্রবেশ করেছে ৩ কোটি ১২ লাখ। ২০১৫ সালে এসেছিল প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ সেট। ২০১৪ সালে যা ছিল প্রায় ২ কোটি। এগুলোর মধ্যেও অনেক সেট এখন নষ্টের তালিকায়।

 এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ মোবাইলফোন ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমপিআইএ) সাধারণ সম্পাদক রেজওয়ানুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, বাংলাদেশে মোবাইলফোন ব্যবহারের সময়কাল এরইমধ্যে ২৩ বছর হয়ে গেছে। এই সময়ে কয়েক কোটি মোবাইলফোন সেট দেশে এসেছে। ব্যবহারযোগ্যতার দিক থেকে শুরুর দিকের মোবাইল সেট এখন আর সচল নেই। আমার হিসাব মতে, সেসব নষ্ট মোবাইলের পরিমাণ ৩ কোটিরও বেশি হতে পারে। তিনি বলেন, ‘এসব নষ্ট মোবাইল সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে রিসাইক্লিং বা ডাম্পিং করা হয়নি। তবে সেসব কোথায় গেছে তা কেউ জানে না।’

দেশে অকেজো-নষ্ট কম্পিউটার, মোবাইলফোন রিসাইক্লিং করা হয় না। ফেলে দেওয়া হয় যেখানেসেখানে। তবে কিছু-কিছু অকেজো-নষ্ট কম্পিউটার ব্যক্তিগত উদ্যোগে সংগ্রহ করা হয় নতুন করে ব্যবহার করার জন্য। অর্থাৎ নষ্ট কম্পিউটারের মধ্যে যেটুকু ভালো অংশ (যন্ত্রাংশ) আছে, তা সংগ্রহ করে অবশিষ্টাংশ ফেলে দেওয়া হয়। কিন্তু এসব ই-বর্জ্য কোথায় যায়, সে বিষয়ে কারও কাছে কোনও তথ্য নেই। কেউ জানেও না।