বিয়ের মৌসুমে জামদানির সাত সতেরো


ষড়ঋতুর দেশে বছর ঘুরে এসেছে হেমন্তকাল। প্রকৃতিতে বইছে হালকা শীতল হাওয়া। অনুষ্ঠান উদযাপনের প্রকৃত সময় শীতকাল। বাংলাদেশে এই সময়টাকে বলা হয় বিয়ের সিজন। ইতিমধ্যেই অনেক পরিবারে শুরু হয়েছে বিয়ের আয়োজন। বাঙালি বিয়ের কেনাকাটায় শাড়িই অনেকটা বাজেট দখল করে থাকে। বিয়ের কনে হোক, কিংবা আমন্ত্রিত নারী অতিথি, সবার চিন্তা থাকে সবচেয়ে সুন্দর শাড়িতে নিজেকে সাজিয়ে বিয়ের অনুষ্ঠানে হাজির হওয়া। কারণ বঙ্গ ললনাদের এমনিতেই শাড়ির প্রতি অন্যরকম একটি ভালোলাগা কাজ করে। আর দেশিয় শাড়ির কদর তো বাঙালিরাই সবচেয়ে ভালো বুঝবে। তাই বেশ কয়েক বছর ধরে বিয়ের অনুষ্ঠানের অতিথি থেকে শুরু করে বিয়ের কনেরাও বেছে নেন দেশিয় শাড়ি। আর এরমধ্যে সবার শীর্ষে আছে জামদানি শাড়ির কদর।

একটা সময় ছিল, বিয়ের শাড়ি মানেই বেনারসি বা জর্জেটে পুঁতি-চুমকির কাজ। কিন্তু এসব থেকে বেরিয়ে এসে একটা সময় জামদানির চল এসেছে বিয়েতে। গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানে আজকাল কনে থেকে শুরু করে বিয়ে বাড়ির অন্যান্য মেয়েরাও জামদানি শাড়িতেই সাজেন। শুধু তাই নয়, অনেকে নিজের বিয়ের শাড়িটিও জামদানিতেই রাখতে চান। কারণ জামদানি মানে তো কেবল ছয় গজের শাড়িই নয়, বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইতিহাস ও ঐতিহ্য।

প্রাচীনকালের মিহি মসলিন কাপড়ের উত্তরাধিকারী হিসেবে জামদানি শাড়ি বাঙালি নারীদের কাছে পরিচিত। মসলিনের উপর নকশা করে জামদানি কাপড় তৈরি করা হয়। জামদানি বলতে সাধারণত শাড়িকেই বোঝান হয়। তবে আগের দিনে জামদানি দিয়ে নকশী ওড়না, কুর্তা, পাগড়ি, রুমাল, পর্দা প্রভৃতিও তৈরি করা হত। ১৭০০ শতাব্দীতে জামদানি দিয়ে নকশা ওয়ালা শেরওয়ানির প্রচলন ছিল। এছাড়া, মুঘল নেপালের আঞ্চলিক পোশাক রাঙ্গার জন্যও জামদানি কাপড় ব্যবহৃত হত।


যেহেতু এখন বিয়ের মৌসুম, তাই জামদানি কেনার আগে জেনে নিন বেশ কয়েকটি তথ্য। জামদানি শাড়ি কয়েক ধরনের হয়, যেমন সূতি জামদানি, হাফ সিল্ক জামদানি, সিল্ক জামদানি। সুতি জামদানি গুলো দেখলেই মোটামুটি বোঝা যায়, হাফসিল্ক আর সিল্কেই যত গেরাকল হয়। ঐতিহ্যবাহী জামদানির বুননের উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন নাম হয়, ছিটারজাল, ফুলতেরসি, জুঁইফুল ইত্যাদি। সম্পুর্ন হাতের বুননের জামদানি-ই প্রকৃতপক্ষে আসল ঐতিহ্যবাহী জামদানি।


হ্যান্ডলুমের জামদানি পরতে যেমন আরামদায়ক, টিকেও অনেক অনেক বছর। হাতে বোনা জামদানি গুলো দেখতে শুধু সুন্দর-ই না, এই জামদানিগুলো শত শত বার পরার পরেও পলিশ করার পর একেবারে নতুন হয়ে যায়, এবং এই শাড়িগুলো ফেঁসে গেলে কালার ফেইড হয়ে গেলেও ঠিক করা যায়, যা মেশিনে বোনা জামদানিতে হয়না। হাতে বোনা জামদানি পরতে যেমন আরাম হয় তেমনি দীর্ঘক্ষণ পরে থাকার পরও স্কীনের বা মেকাপের উপর কোন প্রভাব পরেনা।অন্যদিকে পলিস্টার জামদানি দীর্ঘক্ষণ পরে থাকাতে অস্বস্তি বোধ যেমন হয়, তেমনি এতে ত্বকের নানান সমস্যা হতে পারে।

জামদানি শাড়ির মূল আকর্ষণ এর নকশা বা মোটিফে। জ্যামিতিক ডিজাইনের নকশা দেখলেই বোঝা যায় যে এটা জামদানি শাড়ির। এ নকশা সাধারণত কাগজে এঁকে নেওয়া হয়না। জামদানির শিল্পীরা নকশা আঁকেন সরাসরি তাঁতে বসানো সুতোয় শাড়ির বুননে বুননে। আবার কখনো কখনো তারা ফরমায়েশি কাজও করেন। তখন হয়তো তারা ডিজাইনারের নির্দেশনা মেনে শাড়ির রং নির্ধারণ করেন। কিন্তু নকশা তো সেই আদি প্যাটার্ন বজায় রেখেই হবে। তারা এমনই পারদর্শী- যে মন থেকেই চিন্তা করে ভিন্ন ভিন্ন নকশা আঁকেন। এ নকশা তোলার পদ্ধতিটিও বেশ মজার। শিল্পীদের মুখস্থ করা কিছু বুলি রয়েছে। এসব বুলি ওস্তাদ শাগরেদকে বলতে থাকে আর শাগরেদ তা থেকেই বুঝতে পারে যে ওস্তাদ কোন নকশাটি তুলতে যাচ্ছেন।

নকশার পুরো কাজটি হাতে করতে হয় বলে সময় বেশি লাগে। পুরো জমিনে নকশা করা একটি মোটামুটি মানের শাড়ি তৈরি করতে ন্যূনতম সময় লাগে চার সপ্তাহ বা একমাস। সুতা বা রঙের জন্য দামে যে পার্থক্য হয়ে থাকে, তার চেয়ে অনেক বেশি তারতম্য হয় কাজের পার্থক্যের জন্য। জামদানি শাড়ির দাম নির্ভর করে শাড়ির গাঁথুনি এবং সুতার কাউন্টের ওপর। যত বেশি কাউন্টের সুতা, শাড়ির দামও তত বেশি। সেই সঙ্গে নকশা তোলার সুতার কাউন্টও হতে হবে কম এবং নকশাও হতে হবে ছোট ছোট।

বাঙ্গালি নারী এবং শাড়ি সেই আবহমান কাল থেকেই অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। প্রিয় এক একটা শাড়ির সাথে জড়িয়ে থাকে অনেক মধুর স্মৃতি। তাই প্রতিটি শাড়িই তাদের কাছে মহামূল্যবান। কিন্তু শাড়ি শুধু যত্ন করে পরলেই হবেনা, খুব যত্নসহকারে এদেরকে তুলে রাখতে হবে আলমারি বা ওয়ারড্রবে। আমাদের প্রিয় জামদানি শাড়ি যেমন ঐতিহ্যের দিক দিয়ে সেরা, তেমনি এর যত্নটাও নিতে হয় খুব নিখুঁতভাবে। শাড়ি অনেক প্রিয় হলেও এগুলো নিয়মিত পরা সম্ভব হয়ে ওঠে না কর্মব্যস্ত জীবনে। তাই তাদের জায়গা হয় আলমারি বা ওয়ারড্রবে। কিন্তু যেনতেনভাবে রেখে দিলেও আরেক বিপদ, ক’দিন পরই দেখা যায় শখের প্রিয় শাড়িগুলো সব ভাঁজে ভাঁজে ফেঁসে গিয়েছে, না হয় ফাঙ্গাস পরে একাকার অবস্থা দাঁড়িয়েছে। এমন হলে ভাঁজ খুলে নষ্ট হওয়া শাড়িটি দেখে মুখ ভার করে বসে থাকতে হবে। তাই আসুন জেনে নিন কীভাবে জামদানি শাড়ির যত্ন নিতে হবে।

জামদানি শাড়ি ব্যবহারের পর ভাঁজ করে অনেক দিন রেখে দিলে তা ভাঁজে ভাঁজে ফেঁসে যেতে পারে। আবার হ্যাঙ্গারে করে ঝুলিয়ে রাখলেও শাড়ি মাঝখানে ফেটে যায়। তাই জামদানি শাড়ি হ্যাঙ্গারে ঝুলিয়ে বা ভাঁজ করে না রাখতে নেই। রোল করে রাখতে পারেন কোন শক্তকাঠের ঊপর, যেভাবে রাখা হয় থান কাপড়। এভাবে রাখলে জামদানি কখনোই নষ্ট হবেনা।

হাফসিল্ক জামদানি শাড়ি অন্যান্য সাধারণ শাড়ির মতো ঘরে ধুলে নষ্ট হয়ে যাবে নিশ্চিত। তাই ঘরে না ধুয়ে ড্রাইওয়াশ করানো ভালো। এছাড়া সবচেয়ে ভালো হয় জামদানি শাড়ি কাটা করালে। এক্ষেত্রে যারা জামদানি তৈরি করেন তারাও একাজটি করে থাকেন। কাটা করিয়ে নিলে আপনার শখের জামদানি শাড়িটি অনেকদিন পর্যন্ত ভালো থাকবে।

কিছুদিন পরপর শাড়িগুলো খুলে রোদে দিয়ে ভালো করে বাতাসে ঠান্ডা করে আবার যত্নসহকারেই আলমারিতে রেখে দেবেন। মনে রাখবেন রোদ থেকে এনে সাথে সাথেই তা আলমারিতে ঢুকিয়ে রাখলে আপনার শাড়িটি আর ভালো থাকার সম্ভাবনা নেই।

জামদানি পরার পর যদি কোন দাগ পড়ে যায়, তাহলে তা নিজের হাতে ঘসে ঘসে না উঠিয়ে সেখানে ট্যালকম পাউডার ছিটিয়ে দিন, তারপর ড্রাইক্লিনিংয়ে দিন।
জামদানির নিচের পাড়ে অবশ্যই ফলস পাড় লাগিয়ে নেবেন কেনার পরপরই, তাহলে ময়লা বা জূতার ঘসাতে নিচের পাড়টা নষ্ট হবেনা, টেকসই থাকবে।

জামদানির বুনন এই শিল্পকে করে তুলেছে অনন্য। এই বুনন যেমন পৃথিবীর আর কোনো দেশের তাঁতিদের পক্ষে বোনা সম্ভব নয়, তেমনি অন্য কোনো জায়গাতেও করা সম্ভব নয়। অনেকেই চেষ্টা করেছে। এমনকি বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও জামদানি বুননের চেষ্টা করা হয়েছে। তবে সম্ভব হয়নি। এ শাড়ির তাঁতিরা সারাদেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে নেই। আদিকাল থেকেই ঢাকার কাছে রূপগঞ্জ, সিদ্ধিরগঞ্জ ও সোনারগাঁ উপজেলার কিছু অঞ্চলে এ গুণী তাঁতিদের বংশানুক্রমে বসবাস। এই শাড়ি কেবল একজন তাঁতি বুনে যাবেন, তা নয়। বরং শাড়ি প্রস্তুত হওয়ার প্রতিটি পর্যায়ে চাই পারিবারিক সহযোগিতা। নকশায় মিল থাকলেও জামদানি শাড়ি আসলে একেকটি মাস্টারপিস। পোশাকের জনপ্রিয় শোরুম অঞ্জন্স থেকে কিনে নিতে পারেন পছন্দের শাড়িটি। এবারের মৌসুমে বিয়ের জন্য চলছে গাঢ় লাল, ময়ূরাক্ষী নীল, সোনালি, আকাশি, টিয়ে সবুজ রঙ। প্রতিটি জামদানির মূল্য ১০,০০০ থেকে শুরু। তিন-চার মাস আগে থেকে পরিকল্পনা করে বিয়ের জামদানি শাড়ি তৈরি করালে তাতে প্রকাশ পায় আভিজাত্যের ছাপ। এছাড়া বিভিন্ন কালেকশনের জামদানি শাড়ি রুপগঞ্জের জামদানি পল্লীসহ রাজধানীর যেকোনো শাড়ির দোকানে পেতে পারেন। মিরপুরের বেনারসি পল্লীর কয়েকটি জামদানির দোকানেও জামদানি শাড়ির কালেকশন পাওয়া যাবে।