যখন নিতে হয় সাহসী সিদ্ধান্ত


আমরা দোটানায় পড়ি হরহামেশা। দুই নৌকায় পা রেখে বেশি দূর এগোনো যায় না, তাই বেছে নিতে হয় যেকোনো একটা। বেছে নেওয়ার অঙ্কটা সব সময় অত সহজ নয়। জীবনের খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগতে ভুগতে দিশেহারা হয়ে পড়ে অধিকাংশ মানুষ। এই যেমন সাইফ মা-বাবার একমাত্র সন্তান। যুক্তরাষ্ট্রের নামী এক বিশ্ববিদ্যালয়ে বৃত্তি নিয়ে পড়তে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। হঠাৎ বাবা স্ট্রোক করে শয্যাশায়ী। এ পরিস্থিতিতে দেশে মা-বাবার পাশে থাকবেন, নাকি ভবিষ্যৎ পেশাজীবনের কথা ভেবে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমাবেন?
আবার জিনিয়ার কথাই ধরি। বেরিয়ে আসতে চাইছেন একটা বিষিয়ে ওঠা সম্পর্ক থেকে, যে সম্পর্ক তাঁকে কোনো দিন সুখী করবে না। কিন্তু আবেগের কাছে পরাস্ত হচ্ছেন বারবার। এদিকে রাসেল একটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে মোটা অঙ্কের বেতনে কাজ করছেন। আবার বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ায় মিলেছে সরকারি চাকরির সুযোগ। কোনটা বেছে নেবেন এখন? এ অবস্থায় একটা পরিস্থিতির খুঁটিনাটি বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্তে পৌঁছালে ভুলের আশঙ্কা কমে যায়। তবে কালক্ষেপণের সুযোগ না থাকলে দ্রুতই নিয়ে নিতে হয় সাহসী সিদ্ধান্ত।


সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে
কেমন করে নিতে হয় কঠিন সিদ্ধান্ত? কীভাবে প্রস্তুত করতে হয় নিজেকে? আমরা কথা বলেছি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে। করপোরেট কোচের মুখ্য পরামর্শক যীশু তরফদারকে জানালাম জাহিদের কথা। তিনি এখন একটা প্রতিষ্ঠানে আছেন, আরেকটি প্রতিষ্ঠানে বেশি বেতনে চাকরির সুযোগ এল। কিন্তু বেশি বেতনের সঙ্গে সঙ্গে কাজের চাপটাও বেড়ে হবে দ্বিগুণ। পেশাগত ও ব্যক্তিগত জীবনের ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে। কী করবেন জাহিদ? যীশু তরফদার বললেন, ‘সিদ্ধান্ত নিজেকেই নিতে হয়, তবে প্রাজ্ঞ ও অভিজ্ঞ মানুষদের পরামর্শ সিদ্ধান্ত নেওয়ায় সাহায্য করে। সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে দুটো কাজ—তথ্য দিয়ে যৌক্তিকভাবে বিশ্লেষণ করা এবং নিজের মন কতটা সায় দিচ্ছে, সেটা বোঝা। যদি একটা সিদ্ধান্ত যৌক্তিক বিচারে জয়ী হয় এবং মন থেকেও সায় পাওয়া যায়, তবে সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিত। যদি যৌক্তিক বিশ্লেষণ সিদ্ধান্তের পক্ষে যায়, কিন্তু মন সায় না দেয়, তবে অন্য কারও পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে। আবার যৌক্তিক বিশ্লেষণ সিদ্ধান্তটিকে বাদ দিতে বললেও মন যদি সিদ্ধান্তটির পক্ষে থাকে, তবে কিছুটা সময় নিয়ে ভেবে দেখা উচিত। আর যদি যৌক্তিক বিশ্লেষণ ও অনুভূতি দুটোই সিদ্ধান্তের বিপক্ষে রায় দেয়, তবে সেই সিদ্ধান্ত বাদ দেওয়াই শ্রেয়।’

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইউনিটের মনোরোগবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হেলালউদ্দিন আহমেদ বললেন, ছোটবেলা থেকেই ছোটখাটো সিদ্ধান্ত নেওয়ার চর্চাটা গড়ে উঠলে পরবর্তী সময়ে বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়। সিদ্ধান্ত গ্রহণ কোনো একক ঘটনা না, এটা একটা দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। এর জন্য প্রস্তুতি প্রয়োজন। সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় নিজের সামর্থ্য, সক্ষমতা, ঝুঁকির আশঙ্কা—সবকিছুকেই বিবেচনা করতে হবে। বর্তমান সময়ের বিচারে এই সিদ্ধান্ত কতটা উপযোগী এবং দীর্ঘমেয়াদে কী ফল বয়ে আনবে, তা-ও মাথায় রাখতে হবে।
অন্ধ আবেগ নয়, নয় সোজাসাপ্টা যুক্তির পথ
অন্ধ আবেগের কাছে আত্মসমর্পণ যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি সোজাসাপ্টা যুক্তির পথ অনুসরণও কাম্য নয়। চাই এ দুইয়ের ভারসাম্য। একটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আমাদের নিজের কাছে কিছু প্রশ্ন রাখা উচিত। যেমন এই কাজটা না করলে পস্তাব কি না, কী নিয়ে ভয় পাচ্ছি, মন কী বলছে, কিসের জন্য করছি, কার জন্য করছি, এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িত পরিবর্তনগুলো মেনে নিতে পারব কি না, সিদ্ধান্তটা কাজ না করলে করণীয় কী হবে ইত্যাদি। তবে সিদ্ধান্ত দ্রুত নিতে হলে বেশি তথ্যে বা প্রশ্নে নিজেকে ভারাক্রান্ত না করাই ভালো। প্রধান প্রধান বিষয়েই শুধু নজর দেওয়া উচিত। সব সময় নিজের ভেতরে একটা প্রস্তুতি রাখতে হবে, যেকোনো সময় হুট করে সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। কিছু বাড়তি ভাবনা আগাম ভেবে রাখা ভালো।

সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর
একটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর আমাদের মধ্যে সংশয় কাজ করে, সিদ্ধান্তটা ঠিক হলো তো! কোনো কারণে সেটি ঠিকঠাক কাজ না করলে শুরু হয় অনুশোচনা। আবার আমাদের সিদ্ধান্ত কাছের মানুষদের জীবনেও প্রভাব ফেলে বলে একটা দায়িত্বও থেকে যায়।
বিচার-বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছালে তার ওপর আস্থা রাখা উচিত। কারণ সর্বোচ্চ চেষ্টাটা ছিল এই সিদ্ধান্তের পেছনে। আসলে সিদ্ধান্তের ভালো-মন্দের বিষয়টা আপেক্ষিক। কোনো সিদ্ধান্তই শতভাগ সুফল আনে না। সিদ্ধান্তটি ভুল না সঠিক, সে বিচার সময়ের হাতে। অনেক পরিস্থিতির ওপর আমাদের নিয়ন্ত্রণ নেই। তাই কোনো সিদ্ধান্ত ঠিকঠাক কাজ না করলে নিজেকে দায়ী করা উচিত না; বরং ইতিবাচকভাবে করণীয় বিষয়ের দিকে নজর দেওয়া উচিত। কোনো সিদ্ধান্তই সব পক্ষকে সন্তুষ্ট করবে না। তাই সবাইকে খুশি করার প্রবণতা বাদ দিলে অহেতুক চাপ থেকে রেহাই পাওয়া যায়। একেকজনের জীবনে অগ্রাধিকার একেকটা। একজনের জীবনে যে সিদ্ধান্ত সঠিক, অন্যজনের জীবনে হয়তো সেটি ভুল। সিদ্ধান্তকে তাই যার যার অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। একবার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে গেলে সেটার সফল বাস্তবায়নে চাই আত্মবিশ্বাস, আন্তরিকতা ও সাহস।