বিশ্ব যত এগিয়ে, আমরা তত পিছিয়ে?


ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের অন্যতম হাতিয়ার ইন্টারনেট ব্যবহারে পিছিয়ে পড়ছি আমরা। সম্প্রতি প্রকাশিত এক সূচকে এক বছরে বাংলাদেশ ১৩ ধাপ পিছিয়ে পড়েছে বলে জানা গেছে। বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারের এমন একটি চিত্র উঠে এসেছে বৈশ্বিক ইন্টারনেট ফোরাম অ্যালায়েন্স ফর অ্যাফোর্ডেবল ইন্টারনেটের (এফোরএআই) ‘অ্যাফোর্ডেবিলিটি রিপোর্ট ২০১৭’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে। এই প্রতিবেদন বলছে, বিশ্বের ৫৮টি উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশের মধ্যে ইন্টারনেট ব্যবহার সক্ষমতায় বাংলাদেশের অবস্থান এখন ৪৬, যা আগের বছর ছিল ৩৩। এক বছরে বাংলাদেশ ১৩টি দেশের পেছনে পড়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে এ তালিকায় বাংলাদেশের আগে আছে শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, ভারত ও নেপাল। তালিকায় শ্রীলঙ্কা আছে ২৪ নম্বরে। এ ছাড়া পাকিস্তান ২৮, ভারত ৩৫ ও নেপাল ৪১ নম্বরে রয়েছে। (প্রথম আলো, ১৭ মার্চ ২০১৭)।


প্রতিবেদন থেকে এটি প্রতীয়মান হয় যে আগের বছরের চেয়ে আমাদের সার্বিক অগ্রগতি হলেও (গত বছর আমাদের সার্বিক স্কোর ছিল ৩৯ দশমিক ১৩ আর এ বছর তা হয়েছে ৩৯ দশমিক ৪১), অন্যরা আমাদের চেয়েও বেশি এগিয়েছে। ডিজিটাল সমাজ বিনির্মাণে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি বটে, তবে অন্যদের চেয়ে এগিয়ে থাকতে হলে, বিশেষ করে দেশের সব মানুষের কাছে সহজে ইন্টারনেট পৌঁছে দেওয়ার জন্য আমাদের আরও অনেক কাজ করা প্রয়োজন। এই প্রতিবেদনে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ১৩ শতাংশ বা ২ কোটির কিছু বেশি মানুষ প্রকৃত অর্থে ইন্টারনেট ব্যবহার করে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

কিন্তু সরকারি হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা বর্তমানে ৬ কোটি ৭০ লাখ, যা দেশের মোট জনসংখ্যার ৪০ শতাংশ। দেখা যাচ্ছে, সরকারি হিসাব আর আন্তর্জাতিক হিসাবটি মিলছে না। এর আগে গত বছর বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লিখিত সংখ্যার সঙ্গেও আমাদের সরকারি হিসাবটি মেলেনি। এর কারণ হলো আমাদের দেশে ৯০ দিন বা তিন মাসের মধ্যে একজন ব্যক্তি একবার ব্যবহার করলেই ইন্টারনেট ব্যবহারকারী হিসেবে চিহ্নিত হন, যা আন্তর্জাতিক হিসাবে গ্রহণযোগ্য নয়। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের বিরাট এক জনগোষ্ঠীকে ইন্টারনেট, বিশেষ করে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের আওতায় আনতে না পারার অনেকগুলো কারণ রয়েছে। এর মধ্যে তামাদি হয়ে যাওয়া জাতীয় ব্রডব্যান্ড নীতিমালাকে হালনাগাদ না করাটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

২০০৯ সালে ২০১৫ সাল পর্যন্ত স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য স্থির করে জাতীয় ব্রডব্যান্ড নীতিমালা, ২০০৯ গৃহীত হয়, যার কার্যকারিতা ২০১৫ সালেই শেষ হয়েছে। তখন থেকে এখন পর্যন্ত এই নীতিকে হালনাগাদ করে এগিয়ে যাওয়ার কোনো রোডম্যাপ তৈরি করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। অথচ সে সময়ের তুলনায় ইন্টারনেট অবকাঠামোতে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হয়েছে: এক. সাবমেরিন কেবলের পাশাপাশি দেশ ভূপৃষ্ঠীয় কেবলের মাধ্যমে ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, দেশের ব্যান্ডউইটথ সক্ষমতা ২০০৯ সালের তুলনায় কমপক্ষে সাত গুণ বেড়েছে; দুই. তৃতীয় প্রজন্মের মোবাইলসেবা সারা দেশে বিস্তৃত হওয়ায় সেবাটি সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে গেছে এবং তিন. ২০০৯ সালের ৩৪ হাজার টাকা দামের ব্যান্ডউইটথের দাম ৫০০ টাকায় নেমে এসেছে। কিন্তু তারপরও আমরা কেন অন্যদের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারছি না?

দামের কথাই ধরা যাক। সারা দেশে ইন্টারনেট প্রাপ্তির মূল উৎস মোবাইল নেটওয়ার্ক। আলোচ্য প্রতিবেদনে মোবাইল ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের দামের বিষয়ে বলা হয়েছে, গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত ৩৯টি দেশে এক গিগাবাইট (জিবি) ইন্টারনেট প্যাকেজ কিনতে নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীর মাথাপিছু মাসিক আয়ের (জিএনআই) গড়ে ২ শতাংশের বেশি খরচ হয়। অথচ বাংলাদেশে একই আয়সীমার লোকদের মাসিক আয়ের ৩ দশমিক ৬৩ শতাংশ খরচ হয় এক জিবি মোবাইল ইন্টারনেট কিনতে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে থাকা একজন শিক্ষার্থী সারা মাসে খাবারের জন্য যত টাকা খরচ করেন, কখনো কখনো ইন্টারনেটের জন্য তাঁকে তার চেয়েও বেশি টাকা খরচ করতে হয়। রাষ্ট্রীয়ভাবে উদ্যোগ নিয়ে প্রতি মেগাবিট ব্যান্ডউইটথের দাম ৫০০ টাকায় নামিয়ে আনা হলেও এর সুফল সারা দেশে পৌঁছে দেওয়া যাচ্ছে না সঠিক নীতিমালার অভাবে। দেশের প্রান্তজনের কাছে ইন্টারনেটসেবা পৌঁছে দেওয়ার জন্য ইন্টারনেট সেবাদাতারা (আইএসপি) এনটিটিএন লাইসেন্সধারী তিনটি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল। কোনো নীতিমালা না থাকায় কখনো কখনো এই তিনটি সংস্থাকে মনে হয় ‘বারো হাত কাঁকুড়ের তেরো হাত’ যন্ত্রণা। তার ওপর ইন্টারনেট বিতরণব্যবস্থার সব ধাপেই ১৫ শতাংশ মূসক ও ১০ শতাংশ রাজস্ব শেয়ারিং যুক্ত। ফলে ১০০ টাকার ব্যান্ডউইটথ ভোক্তার কাছে পৌঁছাতেই ২০০ টাকায় পরিণত হয়। এর একটাই অর্থ, সবখানে ইন্টারনেট পৌঁছানো গেলেও সেটিকে সহজলভ্য করা যায়নি।

অন্যদিকে সারা দেশে তৃতীয় প্রজন্মের মোবাইলসেবা পৌঁছে দিয়ে যখন আমরা আত্মতৃপ্তিতে ভুগছি, ততক্ষণে পার্শ্ববর্তী দেশগুলো চতুর্থ প্রজন্মের নেটওয়ার্কের বিস্তার ঘটিয়ে ফেলেছে। প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তানে এ সেবা চালু হয়েছে ২০১৪ সালেই। হালনাগাদ নীতিমালা ও তার প্রয়োগের অভাবে এসবে আমরা কবে যাব, তা কেউ বলতেও পারে না। তবে শুধু পৌঁছে দেওয়াই ব্যাপার নয়। ইন্টারনেটটা তখন মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের হাতিয়ার হবে, যদি সেখানে প্রয়োজনীয় আধেয় (কনটেন্ট) থাকে। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে আমাদের ইন্টারনেট আধেয় এতই কম যে অধিকাংশ ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ইন্টারনেট বলতে কেবল ফেসবুকে সময় কাটানো বা ইউটিউবে ভিডিও দেখা বোঝে। সম্প্রতি এক জরিপে দেখা গেছে, দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারের ৫৭ শতাংশ ফেসবুক আর ইউটিউবে ব্যয়িত হয়।

অথচ অবকাঠামো ও ইন্টারনেটে আধেয় উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থানও রয়েছে। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালের জুন পর্যন্ত অপারেটরদের সোশ্যাল অবলিগেটরি ফান্ডে (এসওএফ) ৯১৩ কোটি টাকা জমা হয়েছে। এই খাতের অর্থ দিয়েও এ কাজ শুরু করে দেওয়া যায়।

জাতীয় ব্রডব্যান্ড নীতিমালা যথাযথভাবে হালনাগাদ না হওয়ায় এবং এর ফলে পরিবর্তিত বাস্তবতায় কোনো সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য না থাকায় সরকারের টেলিযোগাযোগ বিভাগ ঠিকমতো এগিয়ে যেতে পারছে না বলেই মনে হয়। যত তাড়াতাড়ি ব্যাপারটা সবার চোখে পড়বে, ততই আমাদের মঙ্গল।