মোবাইল ব্যাংকিং: লেনদেন সীমা কমিয়ে দেওয়ায় বিপাকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা


দ্রুততম সময়ে এক স্থান হতে অন্য স্থানে টাকা পাঠানোর অন্যতম জনপ্রিয় মাধ্যম এখন মোবাইল ব্যাংকিং। বর্তমানে এ সেবা ব্যবহার করেই পরিবার পরিজন ও নিকটাত্মীয়ের কাছে টাকা পাঠাচ্ছেন অনেকেই।
এছাড়া এ সেবার মাধ্যমে রেমিটেন্সের অর্থ প্রেরণ, কেনাকাটা, বেতন-ভাতা ও ইউটিলিটি বিল পরিশোধ সবই উল্লেখযোগ্যহারে বেড়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে মোবাইল ব্যাংকিং প্রতারণা। এই প্রতারণা এখন শুধু দেশে নয়, বিদেশেও হচ্ছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার ‘মোবাইল ব্যাংকিং॥ লেনদেন সীমা কমিয়ে দেয়ায় বিপাকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাশীর্ষক শিরোনামে দৈনিক জনকণ্ঠে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা গেছে।
‘মোবাইল অ্যাপস’ ব্যবহার করে বিভিন্ন দেশ থেকে হুন্ডির মাধ্যমে বাংলাদেশে রেমিটেন্সের অর্থ আসছে। এসব অধিকাংশ ঘটনায় ‘বিকাশ’র নাম ব্যবহার করছে প্রতারকচক্র। কখনও বিকাশের নামই পরিবর্তন করে ‘বিকাচ’ নামে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে সংঘবদ্ধচক্র।
এসব প্রতারণা রোধে সম্প্রতি মোবাইল ব্যাংকিংয়ে লেনদেন সীমা কমিয়ে দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ফলে ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ গ্রাহকরা। বিশেষ করে যারা নগদ অর্থ বহন করতে চান না সেই সব ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী।
এদিকে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে লেনদেন সীমা কমলেও অনেকেই এখন কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে টাকা পাঠাচ্ছেন। ফলে বিপুল অংকের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের গ্রাহক সংখ্যা এখন ৪ কোটি ১০ লাখ ৭৮ হাজার দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে ব্র্যাক ব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ‘বিকাশ’ এবং ডাচ-বাংলা ব্যাংকের ‘রকেট’ মোবাইল ব্যাংকিং এ সেবায় সবচেয়ে বেশি এগিয়ে। এ সময়ে ব্যাংকগুলোর মনোনীত এজেন্টের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ১০ হাজার ২৬ জন।
পরিসংখ্যান বলছে, গত ডিসেম্বর মাসে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে ক্যাশ-ইন হয়েছে ১০ হাজার ১৬ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। এ সময়ে ক্যাশ আউট হয়েছে ৯ হাজার ৪৬ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি পর্যায়ে লেনদেন হয়েছে ৩ হাজার ৩৬৮ কোটি ২১ লাখ টাকা। এ সময়ে ২৩৪ কোটি ৮৫ লাখ টাকার বেতন পরিশোধ করা হয়েছে। ডিসেম্বর মাসে ইউটিলিটি বিল পরিশোধ করা হয়েছে ১৮১ কোটি ৩৪ লাখ টাকা।
ওই মাসে অন্যান্য বিল বাবদ লেনদেন হয়েছে ৩৫৮ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। মোবাইল ব্যাংকিং এখন আর শুধু টাকা আদান প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস ব্যবহার করে এখন মোবাইল ফোনের ব্যাল্যান্স রিচার্জ, কেনাকাটার মূল্য পরিশোধ, কর্মীদের বেতন দেয়া, যানবাহনের টিকেট ক্রয়, হাসপাতালের বিল পরিশোধের মতো অনেক কাজই সম্পন্ন করতে পারছেন ব্যবহারকারীরা।
প্রাণের মেলার বই থেকে শুরু করে বিমানের টিকেটও কিনতে পারছেন হিসাবধারী যে কেউ। এছাড়া মোবাইল ব্যাংকিং সার্ভিসের ওপর নির্ভর করে বিভিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ব্যবসা ও ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান, অনলাইন শপিং, ফেসবুক ভিত্তিক ব্যবসা পেজ খুলে বাণিজ্য করছেন অনেকেই।
এসব ক্ষুদ্র ব্যবাসায়ী তাদের সরবরাহকারীদের পাওনা পরিশোধ এবং ক্রেতাদের পেমেন্ট গ্রহণ করছেন মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস ব্যবহারের মাধ্যমে। এছাড়া বড় বড় প্রতিষ্ঠানও তাদের খুচরা সরবরাহকারীদের লেনদেন পরিশোধ করছেন এই সেবার মাধ্যমে।
তবে সম্প্রতি অবৈধ পথে রেমিটেন্সের অর্থ পাঠানো ও বিতরণ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণের পর গত ১১ জানুয়ারি মোবাইল ব্যাংকিং সেবার সীমা কমিয়ে দেয়া হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, ব্যক্তি হিসেবে দিনে সর্বোচ্চ ১৫ হাজার টাকা ও মাসে সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা জমা দেয়া যাবে।
আগে একজন গ্রাহক তাঁর হিসাবে দৈনিক ৫ বার ও মাসে ২০ বার টাকা জমা দিতে পারতেন। এ ক্ষেত্রে প্রতিবার ২৫ হাজার টাকা ও মাসে দেড় লাখ টাকা জমা দেয়ার সুযোগ ছিল। পাশাপাশি নগদ অর্থ উত্তোলনের সীমা কমিয়ে দেয়া হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় দিনে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা ও মাসে ৫০ হাজার টাকা উত্তোলনের সুযোগ রাখা হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে দিনে সর্বোচ্চ ২ বারে ও মাসে ১০ বার অর্থ উত্তোলনের সুযোগ দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি একটি হিসাবে অর্থ জমার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ৫ হাজার টাকার বেশি অর্থ উত্তোলন করা যাবে না বলে জানানো হয়েছে। আগে দিনে ২৫ হাজার টাকা ও মাসে দেড় লাখ টাকা অর্থ উত্তোলনের সুযোগ ছিল।
এছাড়া ৫ হাজার টাকা বা এর বেশি ক্যাশ আউট করার ক্ষেত্রে অবশ্যই এজেন্টকে জাতীয় পরিচয়পত্রের মূল বা ফটোকপি প্রদর্শন করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনায় আরও বলা হয়, একজন ব্যক্তি যে কোন মোবাইল ব্যাংকিং সেবায় একটি মাত্র হিসাব রাখতে পারবেন। যাদের একাধিক মোবাইল ব্যাংকিং হিসাব চলমান রয়েছে, তা দ্রুত বন্ধ করে দিতে হবে।
একটি বেসরকারি ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা  বলেন, মোবাইল ব্যাংকিংয়ে লেনদেন সীমা কমায় অনেকেই এখন কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে টাকা পাঠাচ্ছেন। বেআইনি হলেও বেশ কয়েকটি কুরিয়ার সার্ভিস দেশের যে কোনো প্রান্তে ১ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ১ কোটি টাকা পর্যন্ত পাঠাচ্ছে। যা রীতিমতো আইন লঙ্ঘন। ফলে বিপুল অঙ্কের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার।
সূত্র জানায়, বিদেশে জনশক্তি রফতানির পরিমাণ বাড়লেও রেমিটেন্স প্রবাহ বাড়েনি, বরং কমেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে রেমিটেন্স কমেছে ১৫ দশমিক ৭৫ শতাংশ।
‘বিকাশে’র নাম ব্যবহার করে প্রবাসীদের অর্থ দেশে পাঠানোর অবৈধ ব্যবস্থা ঠেকাতেই দেশটির অর্থনৈতিক উন্নয়ন বিভাগ দুবাইয়ের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে থাকা দোকানগুলোতে অভিযান চালায়। এসব দোকানের কোনটিরই সেখান থেকে অন্য দেশে অর্থ পাঠানোর অনুমোদন ছিল না। টাকা পাঠানো প্রবাসীদের কোন রসিদও দেয়া হতো না। 
বিকাশের মুখপাত্র জাহিদুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের পরামর্শে বিকাশ আট দেশের রাষ্ট্রদূতকে চিঠি দিয়েছে। যারা বিকাশের নাম ও লোগো ব্যবহার করে অবৈধ ও অননুমোদিত ব্যবসা করছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। এরপরই দুবাই সরকারের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর চৌধুরী বলেন, একশ্রেণীর অসাধু ব্যক্তি বিকাশের নাম ব্যবহার করে এ দেশের সাব-এজেন্ট দিয়ে গ্রাহকের টাকা দ্রুত পৌঁছে দিচ্ছে। এ অর্থ ব্যাংকিং চ্যানেলে না আসায় রেমিটেন্স কমছে। এ অবস্থায় দ্রুত রেমিটেন্স সেবা নিশ্চিত করতে ওভারসিজ এজেন্ট ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করার চিন্তা-ভাবনা চলছে।