খাবেন নাকি ঢাকাইয়া ঠাণ্ডা ?



আসছে গ্রীষ্ম কাল ।  গরমে ঠাণ্ডার আরাম পেতে চলে আসতে পারেন পুরান ঢাকায়। পুরান ঢাকার ঠাণ্ডা মানে মিহি কুচির বরফ দেয়া লেবুর শরবত, লাচ্ছি, পেস্তাবাদামের শরবত, দই-চিড়া, ফালুদা কিংবা কুলফি মালাই। আপনার প্রাণ জুড়ানোর জন্য ঠাণ্ডার সব ধরনের উপকরণই রয়েছে এখানে। গরমের মতই ঢাকাই জ্যাম ঠেলেঠুলে পুরান ঢাকা এলে ফিরতে পারবেন প্রাণ জুড়িয়েই!


ঢাকাই ঠাণ্ডার ইতিবৃত্ত

ঢাকাইয়া পরিবারগুলোতে এক সময় বিশেষ বিশেষ খাবার রান্না হত। প্রচলন ছিল ইরানি, আর্মেনীয় আর মুঘল খাবারের। তবে ইতিহাসবিদদের মতে মুঘল খাবার হলো পুরান ঢাকার খাবারের মূল বৈশিষ্ট্য। ঢাকার খাবারের ইতিহাস ঘেটে অন্যান্য মুঘল খাবারের সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের শরবতের সন্ধান পাওয়া যায়। ধারণা করা হয় বিশ শতকের চকবাজার ইসলামপুরে অন্যান্য খাবারের দোকানের সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের শরবতের দোকান ছিল। বেলের শরবত, তোকমার শরবত, ফালুদা, লেবুর শরবত, দধির শরবত আর মিহিদানা নামের নাশপাতির শরবত বিক্রির প্রচলনের কথা হাকিম হাবিবুর রহমানের স্মৃতিকথা থেকে জানা যায়। এখন যে সকল ঐতিহ্যবাহি শরবত ও লাচ্ছি পান করি আমরা বা ফালুদাসহ বিভিন্ন বরফ ঠাণ্ডা খাবার খেয়ে থাকি, এর বেশিরভাগই মুঘল ঘরানার খাবার বলে ধারণা করা হয়। পুরান ঢাকার শরবতের অন্যতম বৈশিষ্ট্য এসব শরবত সে সময়কার মুসলিম সমাজ বা মুসলিম পরিবারের ঘরে ঘরে প্রচলিত খাবার। সেই অতীত বা পুরানে বিয়ে বা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এমনকি বাড়িতে কেউ বেড়াতে এলে এসব শরবত বা পানীয় এবং আইসক্রিমসহ কুলফি মালাই পরিবেশন করা হত। পুরান ঢাকার আতিথেয়তা আগের সে সুনাম এখনও বজায় থাকলেও ঘরে বানানো শরবত খাওয়ানোর সেসব দিন অতীত হয়েছে। তবে পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী সেসব শরবতের এতিহ্য ধরে রাখতেই কিনা আদি কিছু দোকানঘর সেই প্রাচীন ঐতিহ্য নিয়েই দাঁড়িয়ে আছে আজও। জেনে নিন এমনই কিছু দোকান সম্পর্কে-

বিউটির ঠাণ্ডা

পুরান ঢাকার জর্জকোট যেতে রায়সাহেব বাজারে বিউটি লাচ্ছির অবস্থান। দীর্ঘ ইতিহাস নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বিউটির ঠাণ্ডার বয়স প্রায় একশ বছর। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিউটির চাহিদা বেড়েছে কিন্তু মান কমেনি, সেই আগের মতই রয়ে গেছে। স্বাদে অতুলনীয় বিউটি তিন ধরনের ঠাণ্ডা বিক্রি করে। লেবুর শরবত যা বিউটির শরবত নামে পরিচিত। মিষ্টি দই দিয়ে তৈরি বিউটির লাচ্ছি এবং ফালুদা। মিষ্টি দই-এর লাচ্ছি বিট লবণ দিয়ে পান করতে চাইলে আপনাকে ফরমায়েশ দেওয়ার সময় বলে দিতে হবে। লাচ্ছি, শরবত ও ফালুদা প্রচুর বিক্রি হলেও দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন লাচ্ছি ও শরবতের কারিগর মোহাম্মদ আলাউদ্দিনের মতে লেবুর শরবতটাই গরমে বেশি চলে!


নূরানীর ঠাণ্ডা

শীত-গ্রীষ্ম সারা বছরই চলে নূরানীর লাচ্ছি। প্রায় পঞ্চাশ বছরের ওপরে নূরানী তাদের লাচ্ছি সুনামের সঙ্গে বিক্রি করে চলেছে। বিয়ে-জন্মদিন ও অন্যান্য সামাজিক অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানেও নূরানী লাচ্ছির চাহিদা অনেক। নূরানীর লাচ্ছির দোকানের নাম নূরানী কোল্ড ড্রিংকস হলেও সাধারণের কাছে নূরানী লাচ্ছি নামটিই বেশি পরিচিত। সকাল আটটায় শুরু হয় এখানকার বিকিকিনি, চলে রাত ১২টা পর্যন্ত। পাওয়া যায় স্পেশাল লাচ্ছি, সাধারণ লাচ্ছি এবং লেবুর সরবত। নূরানী লাচ্ছির প্রতিষ্ঠাতা আব্দুল বারেক। প্রায় ৬০ বছর আগে তিনি বারেকের লাচ্ছি নামে চকবাজার এলাকায় লাচ্ছির ব্যবসা শুরু করেন। তিনি মারা গেলে হাল ধরেন তার সন্তান নুরুদ্দিন। নুরুদ্দিনের নূর থেকেই দিনে দিনে লাচ্ছির দোকানের নাম হয়ে যায় নূরানী। বর্তমানে নূরানী লাচ্ছির পরিচালক নূরদ্দিনের ছেলে মকবুল হোসেন। নূরানীর লাচ্ছি পান করতে হলে আপনাকে যেতে হবে পূরান ঢাকার ১১৮ চক বাজারে।

আল-রাজ্জাকের ঠাণ্ডা

মালিটোলার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী হোসেন মোল্লা ১৯৯৩ সালে বংশালের কাছের নর্থ সাউথ রোডের তার নিজস্ব যায়গায়, ঢাকাই খাবারের ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য শুরু করেন হোটেল ব্যবসা। আল-রাজ্জাক হোটেলের বিখ্যাত গ্লাসির মতোই এখানকার লাচ্ছি ও ফালুদার জনপ্রিয়তা কম না বরং বেশি বলা চলে। গুলিস্তান পেরিয়ে একটু সামনে মালিটোলার রাস্তার ওপর আল-রাজ্জাক হোটেল।




রয়েলের ঠাণ্ডা

পুরান ঢাকায় প্রচলিত আছে ঢাকাবাসীর কেউ কেউ লালবাগ কেল্লায় না গেলেও রয়েল হোটেলে একবার হলেও এখানকার ঠাণ্ডা পান করতে গেছেন! লালবাগ এলাকার ৪৪ হরনাথ ঘোষ রোডে অবস্থিত রয়েল হোটেলের কোথাও কোনও শাখা নেই। ১২ বছর নানান ভাবে ভোজনরসিকদের মন মতো খাবারের চাহিদা পূরণ করে আসছেন। অন্যান্য খাবারের সঙ্গে শীত-গ্রীষ্ম সব সময়ই এখানে ঠাণ্ডাজাতীয় খাবার পাওয়া যায়। এসব খাবারের অন্যতম হল- লাবাং, বোরহানি, মালাই কুলফি, ফালুদা, লাচ্ছি, পাঞ্জাবি লাচ্ছি, দইবড়া এবং পেস্তাবাদামের শরবত।