শুল্ক বৈষম্যে দেশে তৈরি হচ্ছে না মোবাইল ফোন

 

দেশে মোবাইল ফোন ও সংশ্লিষ্ট পণ্যের বাজার আট হাজার কোটি টাকা। ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের প্রেক্ষাপটে দেশে মোবাইল ফোনের চাহিদা বাড়লেও আট হাজার কোটি টাকার এ বাজার পুরোটাই আমদানিনির্ভর। মূলত মোবাইল ফোনের যন্ত্রাংশ ও কাঁচামাল আমদানিতে ভ্যাট-ট্যাক্স পূর্ণাঙ্গ হ্যান্ডসেট আমদানির তুলনায় কয়েক গুণ বেশি হওয়ায় দেশে ফোন তৈরি ও সংযোজন করতে পারছেন না উদ্যোক্তারা।


বাংলাদেশ মোবাইল ফোন ইম্পোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএমপিআইএ) সূত্রমতে, বর্তমানে তৈরি হ্যান্ডসেট আমদানিতে ৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক, ১৫ শতাংশ ভ্যাট, ২ শতাংশ এআইটি এবং ১ শতাংশ সারচার্জ মিলিয়ে মোট ২৩ শতাংশ ট্যাক্স দিতে হয়। তবে মোবাইলে যন্ত্রাংশ আমদানিতে ভ্যাট-ট্যাক্সের পরিমাণ ক্ষেত্রবিশেষে দ্বিগুণেরও বেশি। এখন মোবাইল ফোনের মাদারবোর্ড আমদানিতে ৩৭.০৭ ভাগ, মোবাইলের ব্যাটারিতে ৫৯.৮৯, ব্যাটারি চার্জারে ৩৭.০৭, মোবাইল কিপ্যাড, ব্যাককাভার, ইয়ারফোন আমদানিতে ৫৯.৮৯ এবং অন্যান্য যন্ত্রাংশে ৩৭.০৭ শতাংশ হারে শুল্ক ধার্য রয়েছে। এসব যন্ত্রাংশ ও কাঁচামালের মাধ্যমে দেশে মোবাইল ফোন তৈরি কিংবা সংযোজন করে গ্রাহকের হাতে যেতে যন্ত্রাংশপ্রতি ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ হারে ভ্যাট-ট্যাক্স পড়ে যায়। আর ভ্যাট-ট্যাক্সের এ চরম বৈষম্যে আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও দেশে মোবাইল ফোন তৈরি ও সংযোজন করতে পারছেন না উদ্যোক্তারা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে সিম্ফনি ও ওয়ালটন মোবাইল ফোন শীর্ষ দেশীয় ব্র্যান্ড হলেও চীন থেকে তৈরিকৃত হ্যান্ডসেট বাজারজাত করা হয়। তবে উভয় প্রতিষ্ঠানই বাংলাদেশে মোবাইল ফোন সংযোজন ও তৈরিতে আগ্রহী। এ সম্পর্কে ওয়ালটন গ্রুপের সিনিয়র অপারেটিভ ডিরেক্টর উদয় হাকিম সমকালকে বলেন, দেশে মোবাইল ফোন তৈরিতে তারা খুবই আগ্রহী। এ ব্যাপারে সব ধরনের প্রস্তুতিও তাদের রয়েছে। তবে শুল্ক বৈষম্য নিরসন না হলে শুধু তারা নন, কারও পক্ষেই মোবাইল ফোন দেশে তৈরি ও সংযোজন সম্ভব নয়। এ জন্য মোবাইল ফোন আমদানি এবং দেশে উৎপাদন পর্যায়ে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি জরুরি। তাহলে দেশে মোবাইল হ্যান্ডসেট তৈরিতে আগ্রহী হবেন উদ্যোক্তারা।

এদিকে, 'মেড ইন বাংলাদেশ' স্লোগানে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান টেলিফোন শিল্প সংস্থার (টেশিস) সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে ২০১৫ সালে দেশে মোবাইল ফোন তৈরি শুরু করে ওকে মোবাইল বাংলাদেশ লিমিটেড নামে একটি কোম্পানি।

পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) আওতায় সরকারের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে টঙ্গির টেশিস কম্পাউন্ডে মোবাইল ফোন অ্যাসেমবি্ল প্ল্যান্ট স্থাপন করে প্রতিষ্ঠানটি। একই সময়ে এ ছাড়া ট্যাব, পিএসটিএন হ্যান্ডসেট ও ইন্টারনেট মডেম, মোবাইল ব্যাটারি, স্পিকার, চার্জারসহ নানা যন্ত্রাংশ তৈরিতে ঢাকার অদূরে আশুলিয়া ও কামারপাড়ায় আরও দুটি প্ল্যান্ট স্থাপন করে কোম্পানিটি। প্রায় ৩২ কোটি টাকা ব্যয়ে এসব কারখানা স্থাপন করলেও শুল্ক বৈষম্যে শুরুতেই হোঁচট খায় ওকে মোবাইল। উচ্চ শুল্কে কাঁচামাল ও যন্ত্রাংশ এনে প্রতিযোগিতায় তৈরি মোবাইল ফোন আমদানিকারকদের সঙ্গে কুলিয়ে উঠতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি।

ওকে মোবাইলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী জসিমুল ইসলাম সমকালকে বলেন, 'দেশে মোবাইল ফোন তৈরি করে নতুন যুগের সূচনা করতে তিনটি প্ল্যান্ট স্থাপন করেন তিনি। শুরুতে তাকে আশ্বস্ত করা হয়েছিল, মোবাইলের যন্ত্রাংশ ও কাঁচামাল আমদানিতে ভ্যাট-ট্যাক্সের বৈষম্য তুলে নেওয়া হবে। এ ধরনের আশ্বাসের ভিত্তিতে প্ল্যান্ট স্থাপন করে টেশিস কম্পাউন্ডে মোবাইল সংযোজনও শুরু হয়। শুরুতে প্রায় ২০০ কর্মী নিয়োগ করা হয়। মোবাইল ফোন সংযোজনে ছয় মাসের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের দক্ষ করে তোলা হয়। কিন্তু উচ্চমাত্রায় শুল্ক বৈষম্য থাকায় তার সব স্বপ্ন শেষ হয়ে যায়। অব্যাহত আর্থিক ক্ষতির মুখে যন্ত্রাংশ তৈরির দুটি প্ল্যান্ট গত বছরের সেপ্টেম্বরে বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছেন তিনি। টেশিস কম্পাউন্ডের প্ল্যান্ট চালু আছে। তবে কাজ না থাকায় এখন ২০ জনের মতো কর্মী রয়েছে। টেশিসকে মাসে মাসে প্ল্যান্ট স্থাপনে ব্যবহৃত জমির ভাড়া দিতে হচ্ছে; কর্মীদের বসিয়ে রেখে বেতন দিতে হচ্ছে। ব্যাংকের সুদ টানতে হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, 'সরকারের নানা পর্যায়ে দেনদরবার করছি। এই করে সত্যিকার অর্থে আমি নিঃস্ব হওয়ার পথে।' তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, সম্প্রতি আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদের সঙ্গে দেখা করে বিস্তারিত বলেছেন। আইসিটি প্রতিমন্ত্রী আশ্বস্ত করেছেন। আশা করছি, অচিরেই এ বৈষম্য দূর হবে।

বিএমপিআইএর সাধারণ সম্পাদক রেজওয়ানুল হক বলেন, গত বছর দেশে তিন কোটি ১২ লাখ হ্যান্ডসেট আমদানি হয়েছে, যার বাজারমূল্য প্রায় আট হাজার কোটি টাকা। ফলে দেশের স্বার্থেই মোবাইল ফোন যন্ত্রাংশে শুল্ক বৈষম্য উঠিয়ে দেওয়া সময়ের দাবি। আশা করছি, এ বৈষম্য নিরসনে সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নেবে। পাশাপাশি হ্যান্ডসেট ও যন্ত্রাংশ আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশের মধ্যে রাখার দাবিও জানান তিনি।

দেশে কম্পিউটার এবং মোবাইল ফোন নির্মাণে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে নবগঠিত সংগঠন কম্পিউটার অ্যান্ড মোবাইল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সদস্য সচিব ফাহিম রশিদ সমকালকে বলেন, শুল্প বৈষম্য তৈরি করে দেশের কী লাভ হচ্ছে, তাদের জানা নেই। যেখানে ভারতসহ প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো মোবাইল ফোন তৈরি ও সংযোজনে ট্যাক্স-ভ্যাটে ছাড়সহ নানা রকম প্রণোদনা দিচ্ছে, আমরা তখন উল্টে পথে হাঁটছি। এভাবে তো ডিজিটাল বাংলাদেশ তৈরি হতে পারে না।

চীনে বর্তমানে একজন মোবাইল সংযোজন কর্মীর বেতন ৯০০ ডলার। আর দেশে মাত্র গড়ে ১৫০ ডলারে এ ধরনের কর্মী পাওয়া যায়। ফলে এ খাতে ভালো সম্ভাবনা রয়েছে। ছয় মাসের প্রশিক্ষণ নিলে বাংলাদেশের কর্মীরা এ খাতে ভালো কাজ করতে পারবেন। সম্ভাবনাময় এ খাতকে আটকে রেখে ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের স্বপ্ন সত্যি হবে না।

ফাহিম রশিদ ভারতের উদাহরণ টেনে বলেন, মোবাইল ফোন তৈরি ও সংযোজনে প্ল্যান্ট স্থাপনে উদ্যোক্তাদের নানা সুবিধাও দিচ্ছে দেশটি। এরই মধ্যে স্যামসাং, অ্যাপল, শাওমিসহ বিশ্বের ২০টি ব্র্যান্ডের মোবাইল ফোন তৈরি ও সংযোজন হচ্ছে দেশটিতে। গত বছর দেশটিতে ১০ কোটি মোবাইল ফোন তৈরি ও সংযোজন হয়েছে। এবার ২০ কোটি মোবাইল ফোন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। অথচ আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশের কথা বললেও উদ্যোক্তাদের নিরুৎসাহিত করছি।

তিনি আরও বলেন, এ বৈষম্য দূরীকরণে তারা অর্থমন্ত্রী, ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী এবং রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলেছেন। সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা দিয়েছেন। এর মধ্যে মোবাইল ফোন তৈরিতে ব্যবহৃত প্রয়োজনীয় উপকরণ ও খুচরা যন্ত্রাংশে আমদানি পর্যায়ে সমুদয় ট্যাক্স ও ভ্যাট এবং স্থানীয় উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যাট অব্যাহতি চেয়েছেন। এ ছাড়া নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের জন্য ১৫ বছরের আয়কর অব্যাহতি চেয়েছেন। অর্থমন্ত্রী আন্তরিকতার সঙ্গে বিষয়টি দেখছেন। আশা করা হচ্ছে, দ্রুত এ সমস্যার সমাধান হবে।

আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক বলেন, ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের প্রেক্ষাপটে দেশে কম্পিউটার, ল্যাপটপ ও মোবাইল ফোনের মতো ডিভাইস তৈরিতে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ। প্রধানমন্ত্রী ও আইসিটি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ও এ বিষয়ে আন্তরিক। তিনি এটা নিয়ে কাজ করছেন। আশা করা হচ্ছে, এ খাতের শুল্ক বৈষম্য নিরসনে দ্রুত সুখবর মিলবে।

দেশে মোবাইল ফোন ও সংশ্লিষ্ট পণ্যের বাজার আট হাজার কোটি টাকা। ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের প্রেক্ষাপটে দেশে মোবাইল ফোনের চাহিদা বাড়লেও আট হাজার কোটি টাকার এ বাজার পুরোটাই আমদানিনির্ভর। মূলত মোবাইল ফোনের যন্ত্রাংশ ও কাঁচামাল আমদানিতে ভ্যাট-ট্যাক্স পূর্ণাঙ্গ হ্যান্ডসেট আমদানির তুলনায় কয়েক গুণ বেশি হওয়ায় দেশে ফোন তৈরি ও সংযোজন করতে পারছেন না উদ্যোক্তারা।