সাম্প্রতিক গবেষণা: মশারা কীভাবে ওড়ে?

সাম্প্রতিক গবেষণা: মশারা কীভাবে ওড়ে? 


বিজ্ঞানীরা মশার ওড়ার রহস্যের সমাধান করতে পেরেছেন অত্যন্ত উচ্চগতির ক্যামেরা ব্যবহার করে এবং কম্পিউটার বিশ্লেষণের মাধ্যমে। এই পতঙ্গটি বাতাসে ভেসে বেড়ানোর জন্য কোন বিশেষ কৌশল ব্যবহার করে তা জানার জন্য তারা অত্যন্ত শক্তিশালী প্রযুক্তি কাজে লাগান।


কিছু কাল পূর্বেই ভোমরার ওড়ার বিষয়টি সমাধান করেন তারা। যাতে বলা হয় যে, ভোমরা সাধারণ বায়ুগতিবিদ্যার নিয়ম অনুযায়ী উড়তে সক্ষম হয়না। এখন পর্যন্ত বিজ্ঞান এটা বলতে অসমর্থ হয়েছে যে, কীভাবে মশা অত্যন্ত কম কৌণিক ভাবেও তার পাখা দুটো নাড়াতে সক্ষম  হয় এবং যথেষ্ট উপরে উঠতে পারে।

ন্যাচার সাময়িকীতে প্রকাশিত হয় গবেষণাটি, এতে গবেষক দলটি বর্ণনা করেন যে,  কিউলেক্স মশার ওড়ার ছবি তোলার বিষয়টি ছিলো খুবই কঠিন। কারণ এই মশা প্রতি সেকেন্ডে ৮০০ বার তাদের পাখা ঝাপটায় ৪০ ডিগ্রী কোণে, এটি একই রকম আকারের অন্য পতঙ্গের চেয়ে ৪ গুণ বেশি দ্রুত। এ কারণেই ছবি তোলা অনেক বেশি কঠিন ছিলো।

লন্ডনের রয়্যাল ভেটেরেনারি কলেজ এর অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি এনিমেল ফ্লাইট গ্রুপ এবং জাপানের চিবা ইউনিভার্সিটির সম্মলিত প্রয়াসেই বড় অ্যান্টেনা ও পা যুক্ত এত ক্ষুদ্র প্রাণীর উড়ার ভিডিও ধারণ করার মত প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জকে অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছেন।

ইউনিভার্সিটি অফ অক্সফোর্ড ডিপার্টমেন্ট অফ জুয়োলজি এর গবেষক ড. সিমন অয়াকার বলেন, ‘আমরা এর (মশার) চারপাশে অদৃশ্য ইনফ্রা রেড এলইডি এবং আলোকসজ্জার নকশা  এবং ৮ টি ক্যামেরা  ব্যবহার করি। সাধারণত একটি পতঙ্গকে ভিডিও করতে অন্তত ২ টি  ক্যামেরা ব্যবহার করা হয়। ২ টি ক্যামেরা ব্যবহার করেই আপনি একটি পতঙ্গের অনেক ছবি নিতে পারেন এবং এর ৩ ডি এর সমন্বয় করতে পারেন। কিন্তু মূল সমস্যা হয় অ্যান্টেনা ও পা নিয়ে, যার কারণে ৮ টি ক্যামেরা ব্যবহারের প্রয়োজন হয়, যাতে যেকোন বিন্দু থেকেই মশার ছবি  নেয়া যায়। মশার পাখাগুলো পরিষ্কারভাবে দেখা নিশ্চিত করার জন্যই ব্যবহার করা হয় ৮ টি ক্যামেরা’। 

এই প্রযুক্তিতে তারা প্রতি সেকেন্ডে ১০,০০০ ফ্রেম ছবি তোলেন, যার ফলে পতঙ্গের ওড়ার কৌশলটি প্রকাশিত হয়।

অয়াকার বলেন, ‘মশা তার শরীরের ওজনকে বহনের জন্য বায়ুগতিবিদ্যার ৩ টি কৌশলকে কাজে লাগান। প্রথমত তারা নেতৃস্থানীয় প্রান্তীয় আবর্তনকে (leading edge vortex) কাজে লাগায় যা প্রায় বেশীরভাগ  পতঙ্গই ব্যবহার করে থাকে, কিন্তু অন্য পতঙ্গের চেয়ে মশা এটিকে কম ব্যবহার করে থাকে। দ্বিতীয় ২ টি কারণ হচ্ছে  পেছনের প্রান্তের আবর্তন (trailing edge vortex) এবং চক্রাকারে টেনে নেয়া (rotational drag)। পরবর্তী দুটি পদ্ধতি মশার জন্য আদর্শ পদ্ধতি। এরা উভয়েই সূক্ষ্ম ও সুনির্দিষ্ট ঘূর্ণনের উপর নির্ভর করে প্রতিটি পাখার নাড়ানোর শেষে’। 

পেছনের প্রান্তের আবর্তন (trailing edge vortex) হচ্ছে wake capture এর নতুন একটি ধরন, যেখানে মশা তার তরলের প্রবাহ দ্বারা পাখাগুলোকে সারিবদ্ধ করে, যা তাদের পূর্ববর্তী পাখা নাড়ানোর সময় তৈরি করেছিলো, এটি একটি পুনরায় ব্যবহারযোগ্য শক্তি যা নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

গবেষক দলটি বিশ্বাস করেন যে, এই কৌশলটি তাদের উৎসাহিত করবে ভবিষ্যৎতে খুবই ছোট ফ্লাইং ডিভাইসের জন্য সৃজনশীল  নকশা তৈরি করতে। 

অয়াকার বলেন, ‘আমাদের ছোট ড্রোন আছে কিন্তু মশার মত ক্ষুদ্র পতঙ্গের আকারের নেই যা মাত্র কয়েক মিলিমিটার দীর্ঘ হয়। এই ছোট ড্রোনগুলোর যে কোনটি আপনি কিনতে পারেন, যা সাধারণ  quadcopters। এরা সত্যিই ভালো কাজ করে যখন ঘরের ভেতরে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু বাইরে ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাতাসের কারণে বা আকস্মিকভাবে কোন ঝাপটা এসে লাগলে একে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পরে। অন্যদিকে পতঙ্গরা খুব ভালোভাবেই প্রবল বাতাসকেও মোকাবেলা করতে পারে। তাই পতঙ্গের এই কৌশলটি বুঝতে পারা  আমাদের জন্য উপকারী হবে ভবিষ্যতে’।  

অয়াকার আশা করেন যে, মশার ওড়ার কৌশল বুঝতে পারা আমাদেরকে সাহায্য করবে এটি বুঝতে যে, তারা কীভাবে রোগ বহন করে এবং ক্রমান্বয়ে কীভাবে তাদের এটি করা থেকে বিরত করা যায়। 

বিজ্ঞানীরা মশার ওড়ার রহস্যের সমাধান করতে পেরেছেন অত্যন্ত উচ্চগতির ক্যামেরা ব্যবহার করে এবং কম্পিউটার বিশ্লেষণের মাধ্যমে। এই পতঙ্গটি বাতাসে ভেসে বেড়ানোর জন্য কোন বিশেষ কৌশল ব্যবহার করে তা জানার জন্য তারা অত্যন্ত শক্তিশালী প্রযুক্তি কাজে লাগান।