গরমে ভালো থাকবেন কীভাবে?


গরম মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে। গবেষণায় দেখা গেছে, গরমের সময় মানুষের স্বাস্থ্য সমস্যা বেশি দেখা দেয়। তাই এ সময়ে সতর্ক হয়ে না চললে যেকোনো সময়ই আপনি অসুস্থ হতে পারেন। গরমে সাধারণত যেসব স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিতে পারে যেমন হিট স্ট্রোক, পানিশূন্যতা, ডায়রিয়া, ঘামাচি, হাম, গরমজনিত সর্দি-কাশি, প্রস্রাবে সংক্রমণ ইত্যাদি।
এ বিষয়ে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. গোবিন্দ চন্দ্র রায় বলেন, এই গরমে চলতে-ফিরতে আমরা কম-বেশি সবাই শারীরিক ও মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ি। পরিমিত ও বিশুদ্ধ পানি পান, বাসি-পচা খাবার গ্রহণ না করা, কড়া রোদ এড়িয়ে চলাসহ কিছু নিয়ম সচেতনভাবে মেনে চললে এসব সমস্যা থেকে সহজেই পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব। তবে এই প্রচণ্ড গরমে শিশু ও বৃদ্ধের প্রতি বাড়তি নজর দেওয়া উচিত।

হিট স্ট্রোক
প্রচণ্ড গরমে ও আর্দ্রতায় যে কারও শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়ে হিট স্ট্রোক নামক জটিলতা হতে পারে। শরীরের তাপমাত্রা যখন ১০৪ ফারেনহাইট ক্রস করে, তখনই হিট স্ট্রোক হতে পারে। হিট স্ট্রোক এক প্রকার মেডিকেল ইমার্জেন্সি, যেখানে সঙ্গে সঙ্গে রোগীকে চিকিৎসা না দেওয়া হলে রোগী মৃত্যুবরণ করতে পারে। এর লক্ষণ হলো ঘাম না বের হওয়া, ত্বক লাল হয়ে যাওয়া, শুষ্ক হওয়া, হঠাৎ মাথা ব্যথা, মাথা ঘোরা, বমি ভাব, অস্থিরতা, নিশ্বাস নিতে সমস্যা, হৃৎস্পন্দন বেড়ে যাওয়া এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে না থাকা। ছোট বাচ্চা, বয়স্ক লোক, ব্যায়ামবীর বা দিনমজুরদের হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা খুবই বেশি। শিশু ও বৃদ্ধদের তাপনিয়ন্ত্রণক্ষমতা কম থাকায় হিট স্ট্রোকের আশঙ্কা বেড়ে যায়। বয়স্ক ব্যক্তিরা প্রায়ই অন্যান্য রোগে ভুগে থাকেন কিংবা নানা ওষুধ সেবন করেন, যা হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়।
হিট স্ট্রোকে প্রাথমিক চিকিৎসা
আক্রান্ত লোকটিকে ছায়াযুক্ত একটি জায়গায় নিয়ে আসতে হবে, ভারী কাপড় খুলে দিয়ে গায়ে ঠান্ডা পানি ঢালতে হবে। তাকে সম্ভব হলে ফ্যানের নিচে বা এসি রুমে নেওয়া ভালো। এতে গায়ের ঘাম উড়ে যাবে। সম্ভব হলে তার বগল ও রানের খাঁজে বরফ দিতে হবে।
যদি আক্রান্ত লোকটি পানি পানের মতো অবস্থায় থাকে, তাহলে তাকে ঠান্ডা পানি বা পানীয় পান করতে দিন। থার্মোমিটারে শরীরের তাপমাত্রা ১০১-১০২ ডিগ্রি ফারেনহাইটে আসা না পর্যন্ত ঠান্ডা করা চালিয়ে যেতে হবে।
হিট স্ট্রোক প্রতিরোধ
গরমের সময় শরীরকে পানিশূন্য হতে না দেওয়া। শরীরে পানির পরিমাণ স্বাভাবিক রাখতে প্রচুর পরিমাণ পানি, ডাবের পানি, মুখে খাওয়ার স্যালাইন পান করা।
বেশি গরমের সময় ব্যায়াম বা ভারী কায়িক পরিশ্রম না করা।
গরমে বাইরে বের হলে সাদা বা হালকা রঙের কাপড় পরে বাইরে বের হওয়া।
ঘামের সঙ্গে শরীরের লবণ বেরিয়ে যায়, তাই দুর্বল লাগলে খাওয়ার স্যালাইন খাওয়া।
পানিশূন্যতা
এই গরমে ঘামে শরীর থেকে প্রচুর লবণ-পানি বের হয়ে যায় বলে শরীরে পানিশূন্যতা দেখা দেয়। সাধারণত এর ফলে শরীরের রক্তচাপ কমে যায়, দুর্বল লাগে, মাথা ঝিমঝিম করে। পানিস্বল্পতা গরমের খুবই সাধারণ সমস্যা হলেও অবহেলা করলে তা মারাত্মক হয়ে যেতে পারে। এ সময়ে শরীরের কোষ সজীব রাখতে প্রচুর পানি খেতে হবে। লবণের অভাব পূরণ করতে খাওয়ার স্যালাইন খাওয়া যেতে পারে। শরীরে পানি কম হলে প্রস্রাব হলুদ ও পরিমাণে কম হবে এবং জ্বালাপোড়া বা প্রস্রাবের সংক্রমণ হতে পারে। যে পর্যন্ত না প্রস্রাব স্বাভাবিক রং ফিরে পাবে, সে পর্যন্ত পর্যাপ্ত পানি খেয়ে যেতে হবে। পানির সঙ্গে অন্যান্য তরল যেমন ফলের রস খাওয়া যেতে পারে। ভাজা-পোড়া, অধিক তেল, মসলাজাতীয় খাবার একদমই এড়িয়ে যেতে হবে। সাধারণ খাবার যেমন ভাত, সবজি, মাছ ইত্যাদি খাওয়াই ভালো। খাবার যেন টাটকা হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। চা ও কফি যথাসম্ভব কম পান করা উচিত।
ত্বকের সমস্যা
প্রখর রোদে ত্বকে বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে। এ সময়ে খোলা আকাশের নিচে হাঁটাচলা বেশি হলে সূর্যের অতি বেগুনি রশ্মি ত্বক ভেদ করে কোষের জন্য বিপদ ডেকে আনে। ত্বকে ফোসকা পড়াসহ ত্বক বিবর্ণ হতে পারে। তাই এ সময়ে বাইরে বেরোলে অবশ্যই সানস্ক্রিন ক্রিম ত্বকে মেখে বের হতে হবে। এ সময়ে চোখে সানগ্লাস পরতে হবে। ছাতা ব্যবহার অবশ্যই করতে হবে। যথাসম্ভব হালকা রঙের কিংবা সাদা রঙের পোশাক পরা গরমের জন্য উত্তম।
ঘামাচি নামক যন্ত্রণাদায়ক ব্যাপার হতে পারে। অনেক সময় চুলকাতে থাকে বলে ত্বকে ঘা দেখা দেয়। এ জন্য প্রয়োজন শরীরে যাতে ঘাম ও ধুলোবালি না জমে সেদিকে লক্ষ রাখা। ঘামাচি থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে কখনো সিনথেটিক পোশাক পরা চলবে না। সব সময় সুতির ঢিলা পোশাক পরতে হবে। শরীরে যাতে ঘাম না জমে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। পরিষ্কার পানি দিয়ে গোসল করতে হবে। প্রয়োজনে একাধিকবার গোসল করা যেতে পারে।
ডায়রিয়া
গরম এলেই ডায়রিয়ার প্রকোপ বাড়ে। দুই বছরের নিচে শিশুদের ডায়রিয়ার প্রধান কারণ হলো, রোটা ভাইরাসজনিত সংক্রমণ। চারদিকে ভয়াবহ গরমে যখন গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায়, ঠিক এই সময় চোখের সামনে যে ঠান্ডা পানীয় পাক না কেন, তা দিয়ে গলা ভেজানোতেই মন অস্থির হয়ে যায়। দেখার সময় থাকে না, তা বিশুদ্ধ বা দূষিত কি না। এভাবে এই খাদ্য ও পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে অনেকে। রাস্তাঘাটের অধিকাংশ খাবার দূষিত থাকে, তাই গরমে এই দূষিত খাবার খেয়েই অনেকে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে থাকে। একটু সচেতন হলে এটি এড়ানো যায়। এই যেমন হাত পরিষ্কার করে খাবার খেলে। বাসি, পচা খাবার না খেলে।
সর্দিজ্বর
শিশুদের নিয়ে খুব রোদে ঘোরাঘুরি করলে বাইরের তাপ ও শরীরের তাপের মধ্যে সমতা থাকে না বলে জ্বর হতে পারে। এ জন্য কড়া রোদে তাদের চলাফেরা করতে না দেওয়াই ভালো। জ্বর হলে শরীরে সঞ্চিত শর্করা বেশি হারে খরচ হতে থাকে। এ সময় শরীর থেকে প্রচুর পানি, ঘাম ও প্রস্রাব বেরিয়ে যায়। এ অবস্থায় শিশুকে ফলের রস দিলে খাবারের রুচি বাড়বে এবং স্যুপ খাওয়ালে ক্ষুধা বাড়বে। ফলে শিশুরা খেতে আগ্রহী হবে।
ছত্রাক সংক্রমণ
গরমে শরীরে ঘাম জমে ছত্রাক সংক্রমণ দেখা দিতে পারে। ঘাম শরীরের বিভিন্ন ভাঁজে বিশেষ করে কুঁচকিতে, আঙুলের ফাঁকে ও জননাঙ্গে জমা হয়ে সেখানে ছত্রাক সংক্রমণের পথ বিস্তার করে দেয়। তাই এ সময়ে ছত্রাক সংক্রমণ এড়াতে হলে শরীরের ভাঁজগুলোতে ঘাম জমতে দেওয়া যাবে না। প্রয়োজনে ছত্রাকবিরোধী পাউডার এসব স্থানে ছড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে।