৪৯ বছরের ক্যান্সার রোগীকে ভবিষ্যতের জন্য 'হিমায়িত' করলো চীন!

China-has-frozen-49-year-old-cancer-patients-for-the-future 

মানুষকে প্রচন্ড ঠাণ্ডা তাপমাত্রায় জমিয়ে রেখে দেওয়া বছরের পর বছর, এরপর তাকে আবার উত্তপ্ত করে বাঁচিয়ে তোলা- এমন দৃশ্য শুধু কল্পকাহিনীতেই পাওয়া যায়। এই কল্পকাহিনীকে সত্য করে তুলতে কিন্তু মানুষের চেষ্টার অবধি নেই। কয়েক মাস আগেই “ক্রায়োপ্রিজার্ভেশন” এর ৫০ বছর পুর্তি হলো। আর সম্প্রতি এই প্রযুক্তি নিয়ে আরো একধাপ এগিয়ে গেছে চীনের গবেষকেরা।


গত রবিবার জানা যায়, চীনের প্রথম ক্রায়োপ্রিজার্ভেশন সফল হয়েছে গত মে মাসে। আর এই কাজটাও করা হয় থোরাকটমি (বুক চিরে ফেলা) ছাড়াই। ঝ্যান ওয়েনলিয়ান নামের ৪৯ বছর বয়সী এক নারীকে ক্রায়োপ্রিজার্ভ করা হয়। তিনি ফুসফুসের ক্যান্সারের রোগী ছিলেন। মে মাসের ৮ তারিখে তাকে ক্লিনিক্যালি ডেড ঘোষণা করা হলে তার শরীরটাকে শ্যানডং এর ইনফেং বায়োলজিক্যাল গ্রুপের মেডিক্যাল ল্যাবোরেটরিতে নেওয়া হয়।

ক্রায়োপ্রিজার্ভেশন বা ক্রায়োনিক্স হলো সেই প্রযুক্তি, যেখানে চিকিৎসা করা যাবে না এমন রোগীকে হিমায়িত করে ফেলা হয়, এই আশায় যে ভবিষ্যতে কোনো এক সময়ে তার রোগের চিকিৎসা পাওয়া যাবে এবং তখন তাকে জমাট অবস্থা থেকে বাঁচিয়ে তুলে সারানো যাবে। সাধারণত এর খরচ অনেক বেশি হয়।

ঝ্যান ছিলেন পূর্ব চীনের একজন স্বেচ্ছাসেবী এবং মৃত্যুর পর বিজ্ঞানের কল্যাণে তার শরীর দান করে গিয়েছিলেন তিনি। তার স্বামী গুই জুনপিন এবং তার পরিবার কেমোথেরাপি চলার সময়েই তার শরীর ক্রায়োপ্রিজারভেশনের জন্য দেবার ব্যবস্থা করেন।

সাধারণত শুধু আমেরিকা এবং চীনে ক্রায়োপ্রিজার্ভেশন করা হয়। চীনে পুরো শরীর ক্রায়োপ্রিজার্ভেশনের প্রথম মানুষ হলেন ঝ্যান। এর আগে চৈনিক লেখক ডু হং এর মস্তিষ্ক আমেরিকার অ্যালকর লাইফ এক্সটেনশন ফাউন্ডেশনে সংরক্ষণ করা হয় ২০১৫ সালে।

বিশেষজ্ঞরা ঝ্যানের শরীরে প্রয়োগ করেন অ্যান্টিকোঅ্যাগুলেশন, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং সেন্ট্রাল নার্ভ নিউট্রিশন ইনজেকশন। এছাড়াও তার সংবহনতন্ত্র এবং হৃদযন্ত্র ঠিক রাখার ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

দুই বছর আগে ডু হং এর ক্রায়োপ্রিজার্ভেশনের সাথে জড়িত ছিলেন ডঃ অ্যারন ড্রেক। ঝ্যানের ক্ষেত্রেও তিনি উপস্থিত ছিলেন, সাথে ছিলেন পূর্ব চীনের কিলু হসপিটাল অফ শ্যানডং ইউনিভার্সিটির ডাক্তার এবং বিশেষজ্ঞরা।

রথমে ঝ্যানের শরীরের তাপমাত্রা ধীরে ধীরে ১৮ ডিগ্রী সেলসিয়াসে নামিয়ে আনা হয়। এরপর অটোমেটিক সিস্টেমের সাহায্যে ১২ ঘণ্টারও বেশি সময় পর তার শরীর শূন্যের নিচে ১৯০ ডিগ্রী সেলসিয়াসে আনা হয়। মে মাসের ১০ তারিখে তরল নাইট্রোজেনে ক্রায়োপ্রিজার্ভ করা হয় তার শরীর।
 


ইনফেং এর এক গবেষকের মতে, এই পুরো প্রক্রিয়ায় খরচ হয়েছে ১ মিলিয়ন ইউয়ান বা ১২.২১ মিলিয়ন টাকা। এর পাশাপাশি প্রতি মাসে দুইবার করে তরল নাইট্রোজেন নবায়ন করতে প্রতি বছরে খরচ হবে আরো ৫০ হাজার ইউয়ান। ইনফেং বায়োলজিক্যাল গ্রুপের একটি ফাউন্ডেশন থেকে এই খরচ দেওয়া হয়।

ক্রায়োপ্রিজার্ভেশনের এই প্রযুক্তি চীনে বেশ বিতর্ক তৈরি করছে বটে। ইনফেং এর ডিরেক্টর জিয়া চুনশেং জানান মানুষের শরীর এভাবে ক্রায়োপ্রিজার্ভেশন করার ব্যাপারটা এখনো ল্যাবরেটরি পর্যায়েই আছে, এটাকে আমেরিকার মতো বাণিজ্যিক পর্যায়ে যাবার সম্ভাবনা নেই।

“মিসেস ঝ্যান ক্রায়োপ্রিজার্ভেশন গবেষণায় নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন এবং এই প্রক্রিয়ার ঝুঁকির ব্যাপারে জানানো হয়েছে তার পরিবারকে,” জানান জিয়া।

মানুষকে প্রচন্ড ঠাণ্ডা তাপমাত্রায় জমিয়ে রেখে দেওয়া বছরের পর বছর, এরপর তাকে আবার উত্তপ্ত করে বাঁচিয়ে তোলা- এমন দৃশ্য শুধু কল্পকাহিনীতেই পাওয়া যায়। এই কল্পকাহিনীকে সত্য করে তুলতে কিন্তু মানুষের চেষ্টার অবধি নেই। কয়েক মাস আগেই “ক্রায়োপ্রিজার্ভেশন” এর ৫০ বছর পুর্তি হলো। আর সম্প্রতি এই প্রযুক্তি নিয়ে আরো একধাপ এগিয়ে গেছে চীনের গবেষকেরা।