প্রিয় ট্রাভেলঃ মেঘের দেশে স্বর্গীয় অনুভূতি

Favorite-Travel-Clouds-in-the-country-of-the-heavenly-sense 


জীবন হয়তো মাঝে মাঝে আপনার প্রতি বিরূপ মনোভাব দেখায়। মাঝে মাঝে হয়তো আপনার মনে হয়, চারপাশের তুচ্ছাতিতুচ্ছ ব্যাপারগুলোও আপনার উপর এমনভাবে ভর করে আছে যে, আপনি দমই নিতে পারছেন না। ব্যস্ততা আপনাকে যেন জীবনের ক্ষুতাতিক্ষুদ্র পাওয়াগুলো থেকে অনেক দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। ঠিক তখনই আপনার মনে হতে পারে-- ধূর, সব ছেড়ে ছুড়ে যদি দূরে কোথাও চলে যাওয়া যেত ! একবারে না হোক অন্ততঃ কয়েকটা দিনের জন্য যদি একা হয়ে যাওয়া যেত ! সব ব্যস্ততা আর দম বন্ধ পরিস্থিতি থেকে যদি একটু রেহাই পাওয়া যেত ! তবে হয়তো নতুন করে আরো কয়েকটা দিন বেঁচে থাকার জন্য প্রাণ পেতাম।


কিন্তু ভাবনাটাই সারা কেবল। কোথায় যাবেন, কোথায় পাবেন তেমন স্বর্গীয় জায়গা, কবে মিলবে সেই ছুটি--এইসব ভাবতে ভাবতেই হয়তো পার করে ফেলেন জীবনের আরো কয়েকটি তিক্ত মাস, কয়েকটি বছর। কিন্তু আপনি যদি একবার মন থেকে চেয়ে বসেন-- যা হবার হবে, আমি যাবই--তাহলে দেখবেন, কোনোকিছুই, এমনকি কোনো বাঁধাই আপনাকে আর আটকাতে পারবে না। স্রেফ বের হয়ে পড়বেন। বাকিটা কেবল বিষ্ময় আর বিষ্ময় !! কোথায় যাবন? হ্যাঁ, আজ আপনাদের সামনে আমি বর্ণনা করবো এমন একটি জায়গার যেখান থেকে আপনি আপনার জীবনের প্রথম এবং শ্রেষ্ঠ ভ্রমণটি শুরু করতে পারেন। বলছিলাম, মেঘের দেশ সাজেকের কথা।

সাজেক মূলত রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলায় পড়েছে। কিন্তু সাজেকে আপনাকে যেতে হবে খাগড়াছড়ি হয়ে। রাঙামাটি থেকে সরাসরি সাজেকে যাওয়ার তেমন সহজ কোনো পথ নেই বললেই চলে। খাগড়াছড়ি থেকে সাজেকের দূরত্ব প্রায় ৭২ কিলোমিটার। সময় লাগে কমবেশি দুই থেকে আড়াই ঘন্টা। তো চলুন শুরু করা যাক আমাদের সাজেক ভ্রমণ। প্রথমেই সিদ্ধান্ত নিন আপনি কবে যাচ্ছেন, আর কে কে যাচ্ছেন। তবে দিনক্ষণ ঠিক করা সহজ হলেও সঙ্গী ঠিক করা কিছুটা কঠিন। কারণ সবার হয়তো সামর্থ্য আর সময়ের মিলমিশ নাও হতে পারে। তাই আমি ধরে নিচ্ছি আপনি একাই ভ্রমণের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং সেটা কোনো এক বৃহস্পতিবার রাতে। আপনার ভ্রমণ পরিকল্পনা হচ্ছে-- বৃহস্পতিবার রাতের বাসে আপনি রওনা দিয়ে খাগড়াছড়ি সকালে পৌঁছবেন। সেখান থেকে চাঁদের গাড়িতে করে সকাল সাড়ে দশটার আর্মি স্কটের সাথে সাজেক যাবেন। শুক্রবার রাত সাজেক থাকবেন। শনিবার সকালে যাবেন কংলাক পাড়া। সেখান থেকে ঘুরে এসে সকালের নাস্তা খেয়ে সকাল দশটার আর্মি স্কটের সাথে খাগড়াছড়ি ফিরে আসবেন। তারপর ঘুরবেন খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদ পার্ক, আলুটিলা গুহা, তারেং, রিসাং ঝর্না। তারপর রাতের গাড়িতে চড়ে বসবেন। এবং রবিবার খুব ভোরে ঢাকায় পৌঁছে একটু বিশ্রাম নিয়ে অফিস ধরবেন। তো এই হলো আপনার ভ্রমণের সার সংক্ষেপ।

তো চলুন এবার বিস্তারিত বর্ণনায় যাওয়া যাক। প্রথমেই ভ্রমণের জন্য মনটাকে তৈরী করে নিতে হবে। অর্থাৎ আপনি যে জায়গায় ভ্রমণ করবেন, সেখানকার ভৌগলিক অবস্থান, জীবনমান, আচার-অনুষ্ঠান, ‍কৃষ্টি-কালচার সম্পর্কে মোটামুটি সপ্তাহ খানেক আগে থেকেই স্টাডি শুরু করে দিন। নাহ্, এই স্টাডি পরীক্ষার পড়া প্রস্তুত করার মতো তেমন কিছু না। সেরকম সময়ও আপনাকে দিতে হবে না। বরং আপনি তা করবেন বেশ আনন্দ নিয়ে। অফিসে বা বাসায় কাজের ফাঁকে ফাঁকে ইউটিউব দেখে দেখেই অনেক কিছু জানতে পারবেন আপনি। তারপর তো গুগল আছেই। এটা আমি এজন্য করতে বলছি যে, কোনো জায়গায় ভ্রমণের পূর্বে সেই জায়গা সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা নিয়ে গেলে আপনার ভ্রমণের মজা বহুগুণ বেড়ে যাবে নিঃসন্দেহে।

ধরে নিলাম আপনি আপনার আসন্ন সাজেক ভ্রমণের জন্য যথেষ্ট প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছেন এবং কোনো এক বৃহস্পতিবার রাতের গাড়ির একটি টিকিটও কনফার্ম করছেন। টিকিট পেতে পারেন, কলাবাগান এবং মতিঝিলের আরামবাগ হানিফ, শ্যামলী, সেইন্টমার্টিন পরিবহন এবং শান্তি পরিবহনের এসি/ নন এসি বাসের। ভাড়া পড়বে এসি ৮০০/১০০০ টাকা এবং নন এসি ৫২০ টাকা। তো ধরে নিলাম আপনি নন এসি বাসের রাত সাড়ে দশটার একটি টিকিট কেটেছেন এবং আপনি মতিঝিল আরামবাগ থেকে বাসে উঠবেন। তাহলে বাসা থেকে এমনভাবে বের হন যেন রাস্তায় জ্যাম থাকলেও ঠিক সময় পৌঁছে যেতে পারেন। মনে রাখবেন, ওখানে গিয়ে এক ঘন্টা কাউন্টারে বসে থাকা ভালো কিন্তু বাস মিস করলে সর্বনাশ ! বের হওয়ার আগে ব্যাগ গুছিয়ে নেয়াটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চেষ্টা করবেন যত কম সংখ্যক জামা-কাপড় এবং সরঞ্জাম নেয়া যায়। অর্থাৎ ব্যাগ যত হালকা করা যায়। কারণ আপনি যাচ্ছেন একা এবং আপনার ব্যাগ কেউ বহন করবে না।

আমার মতে শার্ট একদমই পরিহার করুন। একটি টি শার্ট পড়ে যান এবং একটি নিয়ে যান। জিন্স প্যান্ট ভুলেও নেবেন না। ভ্রমণে জিন্স ‍উপযোগী নয়। হালকা কাপড়ের গ্যাভার্ডিন নিতে পারেন। সেক্ষেত্রে একটি প্যান্ট পড়ে যান। আর একটি ব্যাগে নিয়ে যান। আর নিতে পারেন একটি থ্রি কোয়ার্টর টাইপের প্যান্ট। মনে করে অবশ্যই একটি গামছা নিবেন। ব্যাস, কাপড় চোপড় এর বেশি আর একটাও না। মনে রাখবেন আপনি ভ্রমণে যাচ্ছেন এবং সেটা পাহাড়ে। তাই ভুলেও অফিসিয়াল পোশাকে বের হবেন না। ওটা শুধু আপনাকে অস্বস্তিই দেবে না, আপনার হাস্যকর রুচিরও পরিচয় দেবে। এবার সাথে নিন টুথ ব্রাশ এবং দোকান থেকে পাঁচ টাকা দিয়ে কিনে নিন মিনি প্যাক টুথপেস্ট। আর একটি ওডোমোস মশার লোশন। পাহাড়ী একালায় মশার উপদ্রপ খুব বেশি থাকে এবং ওই মশাগুলোর কামড় থেকে হয়ে যেতে পারে ভয়ংকর সব রোগ। তাই এটা নিতে ভুলবেন না। আর এটা ভালো কাজও দেয়। এটার সাথে মাথা ধরার দু একটি ওষুধ নিলেও নিতে পারেন কিংবা বমির ওষুধ। তবে মনে রাখবেন, ভ্রমণ করতে হলে আপনাকে শারিরিকভাবে খুব ফিট থাকতে হবে।

আপনি পাতলা না মোটা সেটা কোনো বিষয়ই না কিন্তু আপনি যদি বের হয়েই মাথা ব্যাথায় ছটফট করেন, কিংবা যাত্রাপথে বমি করে ভাসিয়ে দেন, তবে আমি বলবো আপনার না বেরুনোই ভালো। এবার আসি জুতা প্রসঙ্গে। এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। জুতা নেবেন মাত্র দুইজোড়া। যাবার সময় বাসের ভিতর কমফোর্ট ফিল করার জন্য অবশ্যই স্যান্ডাল টাইপ জুতা পড়ে যাবেন। আর একটা পাতলা দেখে স্নিকারস ধরণের জুতা ব্যাগে পলিথিন দিয়ে পেচিয়ে নেবেন। আপনি চাইলে মোবাইল সাথে নিতে পারেন। তবে আমি চাই বিরক্তিকর এই একটি জিনিস যদি রেখে যেতে পারেন, তবে প্রকৃতির খুব কাছাকাছি পৌঁছে যেতে পারবেন। তবে আমি নিজেই যেহেতু সেটা কখনো পারিনি, তাই আর আপনাকে জোর করলাম না। তবে হ্যাঁ, সাজেকে কিন্তু শুধুমাত্র রবির নেটওয়ার্ক পাবেন। তাই অন্য কানো সিম ভুলেও নেবেন না। ব্যাস হয়ে গেল। এবার আপনি গ্যাভার্ডিন প্যান্টটা পড়ে, পাতলা টি শার্টটা গায়ে চড়িয়ে কাঁধে গামছাটি ফেলে, স্যান্ডেলে পা গলিয়ে আপনার গুছিয়ে রাখা ট্রাভেল ব্যাগটি পিঠে ঝুলিয়ে প্রয়োজনীয় টাকা পয়সা এবং অবশ্যই মনে করে গাড়ির টিকিটটি পকেটে ভরে বেড়িয়ে পড়ুন আল্লাহন নাম নিয়ে। আপনার গন্তব্য বাংলাদেশের দার্জিলিংখ্যাত সাজেক। পরবর্তী সময়গুলোতে আপনি মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন স্বর্গীয় সব অনুভুতি আর কেবল বিষ্ময় আর বিষ্ময়ের সাথে।

জীবন হয়তো মাঝে মাঝে আপনার প্রতি বিরূপ মনোভাব দেখায়। মাঝে মাঝে হয়তো আপনার মনে হয়, চারপাশের তুচ্ছাতিতুচ্ছ ব্যাপারগুলোও আপনার উপর এমনভাবে ভর করে আছে যে, আপনি দমই নিতে পারছেন না। ব্যস্ততা আপনাকে যেন জীবনের ক্ষুতাতিক্ষুদ্র পাওয়াগুলো থেকে অনেক দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। ঠিক তখনই আপনার মনে হতে পারে-- ধূর, সব ছেড়ে ছুড়ে যদি দূরে কোথাও চলে যাওয়া যেত ! একবারে না হোক অন্ততঃ কয়েকটা দিনের জন্য যদি একা হয়ে যাওয়া যেত ! সব ব্যস্ততা আর দম বন্ধ পরিস্থিতি থেকে যদি একটু রেহাই পাওয়া যেত ! তবে হয়তো নতুন করে আরো কয়েকটা দিন বেঁচে থাকার জন্য প্রাণ পেতাম।