যে কোন সম্পর্কে কোন বিষয়গুলো থাকা জরুরি বলে মনে করেন আপনি?

Which-things-do-you-think-are-important-about-any 

প্রশ্নটা শুনে কেউ হয়তো হাসতে পারেন। ভাবতে পারেন- এ আর এমন কি কঠিন প্রশ্ন! উত্তরে মাথার মধ্যে যে শব্দগুলো এসে বাড়ি দিলো সেগুলোই বলে দিলেন গড়গড় করে। কিন্তু কিছুটা সময় নিয়ে যদি ভাবেন, তবে এই সহজ প্রশ্নটা কিন্তু আর সহজ হয়ে ধরা দেবে না আপনার কাছে। 

 
এবার আমরা সকলের কাছে প্রশ্ন রেখেছিলাম- যে কোন সম্পর্কে কোন বিষয়গুলো থাকা জরুরি? এখানে সম্পর্কটা হতে পারে আপনার সাথে আপনার বাবা-মায়ের, ভাই-বোনের, বন্ধুত্বের অথবা আপনার মনের মানুষটির সাথে প্রেমের। সকল সম্পর্কের ক্ষেত্রেই কিছু মৌলিক এবং সাধারণ উপাদান থাকে যেগুলোর অনুপস্থিতিতে সেই সম্পর্কটা কখনোই দাঁড়াতে পারবে না। এই অতি মৌলিক এবং প্রাথমিক উপাদানগুলোর কথা বলেছেন অনেকেই- বন্ধুত্ব, ভালোবাসা, ভরসা, বিশ্বাস, সম্মান, শ্রদ্ধা, পারস্পরিক বোঝাপড়া ইত্যাদি। 

তবে একদম প্রাথমিক এই উপাদানগুলোকে ছাপিয়েও মানুষ ভেদে যেকোন একটা সম্পর্কের ক্ষেত্রে তার নিজস্ব ভাবনার পরিব্যাপ্তি কিন্তু অনেকখানি ছড়িয়ে থাকে। যার কারণ হিসেবে বলা যায়, জীবনযাপনের ধরণের ভিন্নতা, নিজস্ব চিন্তা-চেতনা, জীবনের অভিজ্ঞতা এবং মানুষ ভেদে জীবনের বাস্তবতা একেক জনের কাছে একেকভাবে এসে ধরা দেয়।  

প্রত্যেক মানুষ আলাদা, স্বকীয়। আপনার খুব কাছের এবং পাশের মানুষটার সাথেও কিন্তু রয়েছে আপনার ভিন্নতা। আপনি একটা বিষয়কে যেভাবে দেখবেন, আপনার সাথের মানুষটাও যে একইভাবে সেই বিষয়টাকে দেখবে সেটি কিন্তু নয়। দৃষ্টিভঙ্গী এবং জীবনের অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করেই সাধারণ একটা বিষয়কে একশজন মানুষ একশভাবে ব্যাখ্যা করবে।

প্রচুর মানুষ তার নিজস্ব মতামত জানিয়ে সাড়া দিয়েছিলেন এই প্রশ্নের উত্তর জানিয়ে। তার মধ্য থেকে বাছাইকৃত কিছু মতামত, মতামতকারীর পূর্ণ পরিচয় এবং সম্মতি পূর্বক হুবহু তুলে ধরা হলো।  

সোহরাব হোসেন (২২) 
শিক্ষার্থী (ACCA), ঢাকা
"স্বাধীনতা। রিলেশনের বাইরেও প্রত্যেকটি মানুষের নিজস্ব একটা জগৎ আছে যেখানে সে স্বাধীনভাবে থাকতে চায়। একটা ভাল সম্পর্কের ক্ষেত্রে অবশ্যই একে অপরের এই স্বাধীনতা বোঝা এবং অপরের স্বাধীনতাটা অক্ষুণ্ণ রাখা আবশ্যক।"
আহমেদ তানভীর (২৫)
শিক্ষার্থী এবং সেলফ এপ্লয়েড, চট্টগ্রাম।

"মা-বাবা সন্তানের সম্পর্কের ক্ষেত্রে বলতে গেলে অবশ্যই মা-বাবার উচিত সন্তানের মতামতকে গুরত্ব দেয়া যদি সেটা ভ্যালিড হয় আর তদুপরি সন্তানের উচিত মা-বাবার সিদ্ধান্তকে সম্মান জানানো। এক্ষেত্রে সন্তানের দায়িত্ব বেশি। মনে রাখা উচিত উনাদের দুনিয়াতে অভিজ্ঞতা ঢের বেশি, সাময়িক সুখের জন্য তাঁদের মনে কষ্ট দেয়া উচিত না। এমন নয় যে তারা আপনার কামাই করা টাকা নিয়ে খেয়ে আমোদবিলাস করবে বরং আপনাকে একটা পর্যায়ে দাঁড় করাতে পারলে তারা চোখ বুজে গেলেও শান্তি পাবেন।

ভাই-বোনের সম্পর্ক হচ্ছে দুনিয়ার অন্যতম এক মধুর সম্পর্ক। ভাই-বোন সম্পর্কে ঝগড়াঝাঁটি হয় তবে বনিবনা তারচেয়ে দ্রুত গতিতে ঘটে। এক্ষেত্রে পারস্পরিক সুসম্পর্ক থাকা এবং নিজেদের মধ্যে দুরত্ব থাকাটা অনুচিত। যদি সত্যিই ভালোবেসে থাকেন তবে মনে রাখবেন আপনার খারাপ মুহুর্তে সে অন্যপাশে বসে ভাই বা বোনটির কথাই চিন্তা করছে।

আর, এর বাইরের প্রেম ভালোবাসা। এক্ষেত্রে অবশ্যই একে অন্যকে সম্মান করা লাগবে, বিশ্বাস করা লাগবে। আপনার যদি খারাপ অতীত থাকে তবে নতুনভাবে জীবন শুরু করতে সুযোগ দেয়ার জন্য তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা উচিত এবং যিনি সুযোগটা দিয়েছেন তারও উচিত কখনো অতীতকে টেনে এনে যেনো তাকে মনোকষ্টে না ভোগায়।
"
আনজার
শিক্ষার্থী এবং শিক্ষক, সিলেট।
"অবশ্যই শ্রদ্ধাবোধ থাকতে হবে। তাছাড়া দুজনকেই যত্নশীল, অনুভূতিশীল ও ত্যাগী হতে হবে।"

খন্দকার জিসান (২৪)
শিক্ষার্থী (পলিটেকনিক, সিভিল ডিপার্ট্মেন্ট), রামপুরা।
"আমি মনে করি, কাউকে পর্যাপ্ত সময় দেওয়াটা সম্পর্কের মাঝে একটা গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে। সুখ, দুখের আলাপ করা, একটু মজা করা, সাপোর্ট করা,মান, অভিমান সবকিছু মিলিয়ে একে অপরের সাথে নিজেদেরকে মানিয়ে বা এডজাস্ট করতে সময় লাগে। এভাবে একটা ভাল বন্ধুত্ব গড়ে নিজেদের মাঝে যা একটা ভাল সুসম্পর্ক গড়ে ওঠার ভীত হিসেবে কাজ করে। আজকাল, বেশির ভাগ সম্পর্কের ভাঙন ধরে নিজেদের সাথে দূরত্ব রাখার কারনে।"

সাঈদ শান্ত (১৮)
শিক্ষার্থী, বেনাপোল।
"কোনো সম্পর্কের শুরুতে যেসব দিক খেয়াল করা উচিত তাঁর মধ্য অন্যতম হলো নিজেদের পছন্দ সম্পর্কে একে অন্যকে জানানোকারণ একে-অন্যর পছন্দ সম্পর্কে স্বাভাবিক জ্ঞান থাকলে সম্পর্কটা অনেক রোমান্টিক হয়। তারপর যেটা দরকার সেটা হলো, নিজেদের প্রতি আস্থা রাখা। "চিলে কান নিয়ে গেছে, এমন কোনো প্রবাদে বিশ্বাস না করা। মানে সম্পর্কে তৃতীয় কোনো ব্যাক্তির কথা শুনে নিজেদের মধ্য সমস্যা সৃষ্টি না করা। একে-অন্যকে সময় দেওয়া, নিজেদেরকে বুঝতে চেষ্টা করা, অল্পতে রেগে যাবার টেন্ডেসিটা বাদ দেওয়া।"

ফখরুজ্জামান সায়েম
শিক্ষার্থী (স্নাতকোত্তর, গণিত বিভাগ), শাবিপ্রবি।  
"এক কথায় যদি বলতে হয়, সেটা শ্রদ্ধা। সম্পর্কটির অপর প্রান্তের ব্যক্তিটির প্রতি শ্রদ্ধা থাকাটাই যথেষ্ট। শ্রদ্ধাবোধ বিশ্বাসের অনেক উপরে অবস্থান করে। সম্পর্কে আলাদা করে যদি বিশ্বাস প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন পড়ে তবে সে সম্পর্কের ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। আর শ্রদ্ধাবোধ থেকে ভালবাসা বাই প্রোডাক্ট হিসেবেই চলে আসে। কম্প্রোমাইজিং বলেন আর বোঝাপড়া বলেন এগুলা তখন প্রশ্নাতীত বিষয়। তাই যেকোনো ক্ষেত্রে যেকোনো সম্পর্ক শুরু হোক শ্রদ্ধাকে পুঁজি করে।" 

জিল্লুর কামাল (৩০)
সাংবাদিক, ঢাকা
"যেকোন সম্পর্কের মাঝে স্বচ্ছতা থাকা আবশ্যক। কোন মিথ্যা, লুকোচুরি করা যাবে না যতটা সম্ভব। তবেই সে সম্পর্ক আস্থা পাবে, দীর্ঘ হবে।"
 
সৌরভ হাসান (২৬)
শিখার্থী (সিএসই, এআইইউবি), গ্রিন রোড।
"দুই জন দুই জনের আলাদা মুখোশ ছাড়া চেহারা,আচার-আচরণের সাথে পরিচিত থাকা ও সেটা স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করার ইচ্ছা থাকা। পরস্পরের কাজ/প্যাসন এর ব্যপারটা্তে শ্রদ্ধা রাখা ও এ ব্যাপারে দখলদারি পুরোপুরি বন্ধ রাখা। আমার কাছে যে কোন একটা সম্পর্কের মাঝে এই দুই বিষয়গুলা থাকা জরুরি মনে করি। এই ব্যপারগুলা যদি সম্পর্কের মাঝে থাকে তাহলে একটা সুস্থ সম্পর্কের জন্য বাকি যা যা লাগে তার সবগুলাই চলে আসে।"

ফারিয়া রিশতা (২৫)
মিরপুর, ঢাকা।
"সবার আগে বন্ধুত্ব, দুইজন মানুষকে একে অন্যের সব থেকে ভাল বন্ধু হতে হবে যেখানে মন খুলে সব কথা বলার স্বাধীনতা থাকবে বিশ্বাস তাহলে অটোমেটিক ভাবেই চলে আসবে। আটকে রাখার বা প্রেসার ক্রিয়েট করার মতন ইস্যু যেকোন সম্পর্কের জন্য আনহেলদি। সম্পর্কের স্বাধীনতা না থাকলে সম্পর্কের মর্যাদা থাকে না।"
সোহেল এ মাহমুদ
চাকুরীজীবি, টেক্সাস যুক্তরাস্ট্র
 "যেকোনো সম্পর্কের ক্ষেত্রে পারস্পরিক বিশ্বাস একে ওপরের প্রতি ভালবাসা এবং দায়িত্ববোধ থাকা প্রয়োজন, আর যেকোনো পরিস্থিতিতে সত্য বলার মতো মানসিকতা থাকা দরকার! এই জিনিসগুলো সম্পর্কের মধ্যে থাকলে অন্যান্য গুণাবলীকে আরো দৃঢ় করে সম্পর্কটাকে একটা পর্যায়ে নিয়ে যেতে সহায়তা করে।"

ইমরুল কায়েস শুভ (২২)
শিক্ষার্থী (মার্কেটিং বিভাগ), জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটি 
"অনেকেই বলবে সময় দেওয়া, বেশি করে কেয়ার নেওয়া, খোঁজ নেওয়া নিয়মিত এসবই হয়ত ভালোবাসা! কিন্তু আমার মনে হয় এগুলা ভালোবাসার জোড়ের ভিত্তি হতে পারেনা। ভালোবাসা মানেই হলো ভরসা এবং সঙ্গীকে নিজের ভেতরে অনুভব করা। সম্পর্কে থেকে তোমার, আমার শব্দটা হারিয়ে যখন আমাদের শব্দটা ব্যবহার হয় তখন বুঝতে হবে তা বিশ্বাস, ভরসার চূড়ান্ত অবস্থা। এইটাই ভালোবাসা।" 

পাঠক, আপনারাও জানাতে পারেন আপনাদের সুচিন্তিত মতামত। অথবা লিখে জানাতে পারেন, কীভাবে ভাবেন আপনি আপনার সম্পর্কগুলো নিয়ে, একটা সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোন কোন বিষয়গুলো থাকা খুব বেশী জরুরি বলে মনে করেন আপনি? আপনাদের নিজস্ব ভাবনা, নিজস্ব মতামত

প্রশ্নটা শুনে কেউ হয়তো হাসতে পারেন। ভাবতে পারেন- এ আর এমন কি কঠিন প্রশ্ন! উত্তরে মাথার মধ্যে যে শব্দগুলো এসে বাড়ি দিলো সেগুলোই বলে দিলেন গড়গড় করে। কিন্তু কিছুটা সময় নিয়ে যদি ভাবেন, তবে এই সহজ প্রশ্নটা কিন্তু আর সহজ হয়ে ধরা দেবে না আপনার কাছে।