কী আছে দক্ষিণের সিনেমায়?


একটা তথ্য নিশ্চয়ই জানেন, ভারতে সিনেমার প্রচলন ১৯১৩ সালে। দাদা সাহেব ফালকের হাত ধরে ‘রাজা হরিশচন্দ্রে’র মাধ্যমে। কিন্তু আমরা অনেকেই জানি না সেই নির্বাক সিনেমাটি মারাঠি।

কালের বিবর্তনে সবকিছু ছাড়িয়ে হিন্দী ভাষাভাষী বলিউডের নাম সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। বাঙালি সিনেমাপ্রেমীদেরও আগ্রহের অন্যতম কেন্দ্র বিন্দু এ ইন্ডাস্ট্রি। একটা সময়ে বলিউডের সিনেমা রিমেক করতো ভারতের অন্যান্য প্রাদেশিক সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিগুলো। কিন্তু এখন তার উল্টো হচ্ছে। বলিউড তাকিয়ে থাকে তামিল তেলেগু কিংবা মালায়ালাম সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিগুলোর দিকে। সেখানকার সুপারহিট সিনেমাগুলো এখন প্রায়ই রিমেক করতে দেখা যায় বলিউডে।

বলিউডের চেয়ে বেশি বাজেটের সিনেমা নির্মাণের সাহসও করছেন তারা। ‘বাহুবলি’র পর এখন প্রায় সব সুপারস্টারদের সিনেমা বিগ বাজেটের। বলিউডের স্টারদের চেয়ে বেশি বাজেটের। যেমন ‘সাহো’ ১৫০ কোটি। ‘ভিভেগাম’ ১২০ কোটি। ‘স্পাইডার’ ১২০ কোটি। ‘রোবট ২’ ৪৫০ কোটি। আর বলিউডে ১৫০ কোটি বাজেট তুলতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
একটা সময় প্রাদেশিক সিনেমা সংশ্লিষ্টরা বলিউডের দিকে তাকিয়ে থাকতেন। বলিউডের সিনেমায় সুযোগ রীতিমতো তাদের জন্য ছিল সৌভাগ্যের। অবশ্যই ব্যতিক্রম কিছু ট্যালেন্টের নাম বলতে হবে। যারা দক্ষিণী সিনেমা থেকে বলিউডে এসে বেশ সুনাম কুড়িয়েছেন। তার মধ্যে এ আর রহমান , শ্রীদেবী, মনিরত্নমরা অন্যতম।

বর্তমানে সেসব সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির নায়ক নায়িকাকে বলিউডে নিত্যনৈমিত্তিক ব্রেক দেয়া হচ্ছে। এইতো সেদিন বাহুবলি খ্যত প্রভাসকে বলিউডে সর্বোচ্চ পারিশ্রমিকের অফার করেছে। হয়তো খুব শীঘ্রই বলিউডের কোন সিনেমায় তাকে দেখা যাবে। বর্তমান সময়ের আরেক মালায়ালাম সুপারস্টার দুলকার সালমানকেও খুব শীঘ্রই বলিউডের সিনেমায় দেখা যেতে পারে। এ সময়কার কাজল আগারওয়াল,তামান্না কিংবা তাপসী পান্নুদের বলিউডের সিনেমায় নিয়মিত দেখা যাচ্ছে।
বাজেট আর তাদের স্বকীয় নির্মাণ স্টাইল বেশ জনপ্রিয় এখন সারা ভারতে। শুধু ভারতেই নয়। সারাবিশ্বে তারা মার্কেট গেড়ে বসেছে। বাংলাদেশও তামিল তেলেগু থেকে গেল কয়েকবছরে গণহারে নকল করেছে। দক্ষিণী ছবির এই জয়জয়কারের সময় বলিউডের নিজস্ব ঘরানার সিনেমা প্রতিনিয়ত মার খেয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি বেশিরভাগ বলিউড প্রযোজক, পরিচালক এমনকি তারকারাও দক্ষিণী ছবিমুখী হয়ে পড়েছেন। মূলত রিমেক হওয়া আসল ছবিগুলো ব্লকবাস্টার হিট হওয়ার কারণেই বলিউডে এ প্রবণতা ধীরে ধীরে ব্যাপক হয়ে দেখা দিচ্ছে।
এর মধ্যে আমরা অনেকেই জানি ‘সিংহম’ , ‘গজনী’, ‘ওয়ান্টেড’, ‘রেডি’, ‘বডিগার্ড’, ‘ফোর্স’, ‘হেরা ফেরি’ , ‘ভুল ভুলাইয়া’, ‘ঢোল’, ‘দে দানা দান’, ‘খাট্টা মিঠা’, ‘বিল্লু’ ,‘ আনজানা আনজানি’ ‘নায়ক’ সহ আরো অনেক সিনেমা বলিউডে রিমেক হয়ে গেছে। সামনের দিনেও বেশকিছু সিনেমার স্বত্ব বলিউড প্রযোজকরা কিনে রেখেছে। পর্যায়ক্রমে সিনেমাগুলোর রিমেক করা হবে।
এক কথায় ‘দক্ষিণী’ সিনেমা বললেও তাদের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি মূলত কয়েকটি ভাগে ভাগ করা আছে। প্রাদেশিক হিসাবে তারা আলাদা। মজার ব্যাপার, ভারতে কয় ভাষায় সিনেমা হয় জানেন?২৬ ভাষায়, যা নিশ্চয়ই পৃথিবীর অন্য কোন দেশে নেই! এতগুলো রাজ্যে বিভক্ত যে দেশ সেখানে এমনটা হতেই পারে।
একটু খোঁজ খবর নেয়া যাক, হিন্দির পর সবচেয়ে বড় ফিল্ম মার্কেট দক্ষিণ ভারতের:
৫টি ভাষার ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে গঠিত দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমা। তামিল,তেলেগু, কান্নাড়া,মালায়ালাম ও টুলু ভাষা।

সংক্ষিপ্তভাবে বললে:
তামিল: তামিল নাড়ুর চেন্নাইয়ের কোদাবাক্কামে অবস্থিত তামিল সিনেমার স্টুডিওগুলো। ভারতে সর্বপ্রথম তামিল নাড়ুতে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি স্থাপিত হয়। ১৯১৬ সালে। এই ইন্ডাস্ট্রি কলিউড নামে পরিচিত।

তামিল সুপারস্টারঃ রজনীকান্ত,কমল হাসান, ধানুশ,সুরিয়া,বিজয়,অজিথ কুমার,চিয়ান, বিক্রম,কার্থি, জেবা।

নায়িকাদের মধ্যে সামান্থা, তৃশা, হানসিকা, শ্রুতি, শ্রেয়া, তামান্না, অসিন (এর মধ্যে অনেকেই অন্য ইন্ডাস্ট্রিতেও কাজ করে)

গল্পগুলো কেমন হয়?

মারদাঙ্গা মাসালা কাহিনী বলতে যা বুঝায়। ৭৫% সিনেমার কাহিনী এরকমই মনে হবে। তাই বলে কোন সিনেমা শুরু করলে শেষ না করে উঠতে পারবেন না। প্রতি সিকোয়েন্সে চমকে ভরপুর। বিশ্বাস করতে পারবেন ? সেখানকার মানুষ রজনীকান্তের নামে মন্দির পর্যন্ত বানিয়েছে। তাকে ঈশ্বর তুল্যই মনে করে। তাই ৭০ এর কোঠায় বয়স হলেও  রজনীর ছবি মানেই ব্লক বাস্টার হিট। ইদানিং মাসালা ফিল্ম অনেক কমেছে। বর্তমানে  ছবিগুলোর  কাহিনী বেশ সুন্দর।

তেলুগু সিনেমা: হায়দ্রাবাদের তেলেংগানা ও অন্ধ্রপ্রদেশের সিনেমা নির্মিত হয় তেলুগু ভাষায়। ৮ টা স্টুডিও আছে। পৃথিবীর অন্যতম বড় স্টুডিও রামোজি ফিল্ম সিটি ও এখানে অবস্থিত। এই ইন্ডাস্ট্রি টলিউড নামে পরিচিত।

সুদর্শন,স্টাইলিশ,ড্যান্সিং,ম্যানলি কিছু নায়ক দিয়ে তেলেগু সিনেমা বেশ ভালো অবস্থানে আছে। সেইসাথে টেকনোলজির ব্যবহার,রামোজি ফিল্ম সিটি যেখানে রেল স্টেশন টু স্টেডিয়াম সবই আছে,দারুন সব কন্সেপ্ট,মিউজিক দিয়ে তামিলের শক্ত প্রতিদ্বন্ধী। তেলুগু কমেডিয়ান ব্রাহ্মানান্দম ৮৫৭ টি তেলুগু মুভিতে অভিনয় করে বিশ্বরেকর্ড করেছেন।

তেলুগু সুপারস্টার: চিরঞ্জিবী, পাওয়ান, প্রভাস, কল্যান,নাগার্জুনা, বালাকৃষ্ণা,ভিকটর ভেংকটেশ, রবি তেজা ,মহেশ বাবু, আল্লু অর্জুন, এন টি আর জুনিয়্‌র নাগা চৈতন্য,নিতিন,রামচরণ তেজা,সিদ্ধার্থ

মালায়ালাম সিনেমা:কেরালার ইন্ডাস্ট্রি।বলিউড,কলিউড,টলিউডের তুলনায় বাজার ছোট হলেও মালায়ালাম সিনেমার অবস্থানও কমশক্ত নয়। তাদের সিনেমার সবচেয়ে বড় শক্তি কাহিনীর বিচিত্রতা।

বাংলাদেশে মূলত তামিল তেলেগুর ভক্ত বেশি পাওয়া গেলেও মালায়লাম সিনেমারও প্রচুর দর্শক আছে। গল্পে মূলত থ্রিলার আর নাটকীয়তার উপরই তারা জোর দিয়ে থাকেন। প্রেমাম,ব্যাঙ্গালোর ডেইজ, গ্র্যান্ডম্মাস্টার, দৃশ্যাম,মায়ামোহিনি,চার্লি,কালি,১০০ ডেইজ অফ লাভ। সবগুলোই বেশ জনপ্রিয় সারা ভারতে। সহজ সাবলীল গল্প আর অভিনয়ে অভিনয় শিল্পীরাও বেশ সুনাম অর্জন করছেন। সিনেমায় উগ্র মারামারি কিংবা অসম্ভব কিছু খুবই কম দেখানো হয়।

অভিনয়ে যারা নাম করছেন: মাম্মোথি,পৃথ্বীরাজ, ফাহাদ ফাসিল,নিভিন, মোহনলাল, দুলকার সালমান। 

কান্নাড়া সিনেমা: কর্ণাটকের সিনেমা বলা হয় কান্নাড়া সিনেমা। এই ইন্ডাস্ট্রি ততটা বিশ্বজুড়ে নাম করতে পারেনি। একে বলা হয় স্যান্ডালাউড। ভারতের পঞ্চম সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি বলা হয় একে। এখানে ৯৫০ সিঙ্গেল স্ক্রিন মাল্টিপ্লেক্স আছে। ১৯৭১ সাল থেকে শুরু হওয়া এ ইন্ডাস্ট্রি বছরে ১০০ এর উপরে সিনেমা মুক্তি দেয়।