নায়িকাদের স্মৃতিতে মহানায়ক


ববিতা
আমার প্রথম সিনেমার নায়ক তিনি। আমার নায়ক ছিলেন না কিন্তু। আমি তখন এক কিশোরী। ছবির নাম ছিল ‘সংসার’। তিনি আমার বাবার চরিত্রে। আর বড় আপা সুচন্দা মায়ের চরিত্রে। সে সময় ছবিটা বেশ ভালো ব্যবসা করেছিল। এ ছবি মুক্তির পর প্রস্তাব এল ‘শেষ পর্যন্ত’র। সেখানে তিনি আমার নায়ক। আমি তখন খুব হাসতাম। কথায় কথায় হাসতাম। যা কিছু দেখতাম সবই ভালো লাগত। রাজ্জাক ভাইয়ের কথা শুনে সে কি হাসি। হাসলেও শক্ত হয়ে জানিয়ে দিলাম এ ছবিতে আমার অভিনয় করা হবে না। আগের ছবিতে তিনি ছিলেন আমার বাবা। আর ঠিক তার পরের ছবিতে তার সঙ্গে রোমান্স করতে হবে! এক কথা বলে দিলাম আমাকে দিয়ে হবে না। কিন্তু জহির রায়হানের ছবি বলে কথা। করতে বাধ্য হলাম। জহির রায়হানকে তো সরাসরি ‘না’ বলা যায় না। বলতে গেলে আমি ফেঁসে গিয়ে অভিনয় করলাম। ছবিটি সুপারহিট হলো। আগের সিনেমাটি এর প্রশংসায় ঢাকা পড়ে গেল। সারাদেশের মানুষ প্রশংসা বন্যায় ভাসাতে শুরু করল। এ ছবির পর বিশিষ্ট চলচ্চিত্রকার নারায়ণ ঘোষ মিতা ‘আলোর মিছিল’ নামে একটি সিনেমার প্রস্তাব করলেন। ছবিতে রাজ্জাক ভাই, রোজি, আনোয়ার হোসেন ও আমি প্রধান চরিত্রে। তবে আমার চরিত্রটি হবে রাজ্জাকের ভাগ্নির। বিপত্তী বাধল এখানে প্রস্তাব করা হল রাজ্জাক ভাইয়ের ভাগ্নির চরিত্রে। এটা কীভাবে সম্ভব?নায়িকা থেকে আবার ভাগ্নি! বেশ দুশ্চিন্তায় পরে গেলাম। অনেক ভেবে সিদ্ধান্ত নিলাম হ্যাঁ সিনেমাটি করব আমি। অনেকেই নিষেধ করেছিল। ‘আলোর মিছিল’ নামের সে সিনেমার খবর কে না জানে বলো। বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অন্যতম সুপারহিট সিনেমা। যারা হলে বসে ছবি দেখেছেন তাঁরা কেঁদেছেন বিশেষ করে আমার চরিত্রের মৃত্যু দৃশ্য দেখে।

রাজ্জাক ভাইয়ের সঙ্গে অনেক মিল ছিল আমার। দুজনেই ছোট দুটো চরিত্রের মাধ্যমে ইন্ডাস্ট্রিতে প্রবেশ করেছি। তাঁর পছন্দ অপছন্দের সঙ্গে প্রচুর মিল রয়েছে আমার। আমাকে খুবই স্নেহ করেন। তাঁর পরিবারের সঙ্গে আমাদের পরিবারের একটা আত্মীক সম্পর্ক রয়েছে।

কবরী
‘ময়নামতি’ সিনেমার একটা ঘটনা বলি। লোকেশন সাভারের নয়ারহাট। খুব ভোরে গিয়ে শুটিংয়ের জন্য আমি রেডি হয়ে বাইরে গিয়ে দেখি, ওমা! এত মানুষের ভীড়। হবেই না কেন। তখন তো রাজ্জাক-কবরি জুটি সবচেয়ে জনপ্রিয়। বাচ্চা থেকে বুড়ো। সবাই তাকিয়ে আছে। যতক্ষন শুটিং চলবে। ততক্ষন নাকি দেখবেন। সঙ্গে খাবারও নিয়ে এসেছে। তাদের জন্য একটা উৎসব। তাদেরকে দেখে আনন্দও লাগছে সঙ্গে খানিকটা লজ্জা ও বিরক্তি। বের হওয়ার পর আমি হাঁটছি রাজ্জাক আমার পিছন পিছন। হঠাৎ শুনি হাসির রোল। কী ব্যাপার, লোকজন হাসছে কেন?

ভাবলাম রাজ্জাককে বোধ হয় খেপাচ্ছে।মনে মনে ভাবলাম। খুব ভালো হয়েছে! আমি খুশি খুশি মুখে ঘুরে দেখি রাজ্জাকও হাসছে! কী ব্যাপার! তার হাতে সাপের মতো আমার আলগা চুলের বেণিটা ঝুলছে আর আমার দিকে তাকাচ্ছে আর উপস্থিত সবার দিকে তাকাচ্ছে। রাগে মাথায় আগুন ধরে গিয়েছিল। মনে হল রাজ্জাককে একটা ঘুষি মেরে নাক ফাটিয়ে দেই। আমার দিকে তাকিয়ে বুঝলো যেকোন একটা কিছু হয়ে যেতে পারে। হয় কাঁদবো না হয় শুটিং ছেড়ে চলে যাব। এত অপমানিত বোধ লাগছিল তখন। কাছে এসে চুপি চুপি রাজ্জাক বলল ‘এমন করে চুল বাঁধে।’

আমি কেঁদে দিলাম। অভিমান নিয়ে বললাম ‘তাই বলে আপনিও হাসবেন?’। ‘স্যরি স্যরি’ বলে আলতো করে গালে আদর করে দিল রাজ্জাক। তখন এতটুকুতেই অনেক প্রেম। চোখে পানি, মুখে মিষ্টি হাসি। মনে হলো পৃথিবীটা এখন হাতের মুঠোয়। ‘আপনি একটা ফাজিল অসভ্য’ গালি দিয়ে একা একা হেসে ফেললাম। দর্শকদের কাছে কবরী-রাজ্জাক জুটি ততদিনে অপরিহার্য হিসেবে আলোড়ন সৃষ্টি করে ফেলেছে।

ডলি জহুর
তাঁর পরিচালনায় ‘বাবা কেন চাকর’ সিনেমায় অভিনয় করলাম। ছবিটি নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। কলকাতায় যখন রিমেক হলো। রাজ্জাক ভাই তাতে কাজ করতে বলেছিলেন। আমি খুব বিনয়ের সঙ্গে না করেছিলাম। বলেছিলাম, আমাদের এখানে ছবিটিতে অভিনয় করে যথেষ্ট সাড়া পেয়েছি। একই ছবি আবার কলকাতায় করার কোনো মানে হয় না। রাজ্জাক ভাই তাতে মোটেও অসন্তুষ্ট হননি। তিনি আমার সিদ্ধান্তকে শ্রদ্ধা জানিয়েছিলেন। তার সাথের স্মৃতি আসলে বলে শেষ করা যাবে না।