নিজে হার মেনে না নিলে আমি হেরে যাই না



আমাকে একবার তিনমাসের জন্য কর্মজীবি মহিলা হোস্টেলে থাকতে হয়েছিল, আমার ছেলেটাকে সাথে নিয়ে। সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম এই প্রসঙ্গটা নিয়ে জীবনে কখনো কিছু বলব না।
কারণ তাহলে অনেক কঠিন সত্য বলা হয়ে যাবে। সব সত্য প্রকাশ করা হয়তো ঠিক না।
কিছু কিছু চ্যাপ্টার একান্তই নিজের জন্য রেখে দিতে হয়।

যখন আমার বয়স চল্লিশ/পঞ্চাশ হবে ইনশাআল্লাহ তখন আমার নিজের একটা বাড়ি হবে, লেখাপড়ার একটা রুম থাকবে সেই ছোট্ট স্বপ্নের মতো বাড়িতে, সেই রুমে শতরঞ্জি পেতে আরাম করে পা মেলে বসে গান শুনতে শুনতে চা পান করতে করতে জীবনে দেখা কঠিন সত্যগুলো পটাপট লিখে ফেলব; এমনটা প্ল্যান ছিল। কারণ তখন আমার চিরস্থায়ী আশ্রয় হবে। আশ্রয়হীন হবার আতঙ্কে তখন আর আমি থাকব না। মানুষ নামক প্রাণীরা চাইলেও লোক দেখানো সিম্প্যাথি দেখাতে পারবে না, দু’কথা শুনিয়ে বলবে না বের হয়ে যাও বাসা থেকে।
উল্টো জেলাস হতে থাকবে আমার ভালো থাকা দেখে।

আজ তাহলে কেন লিখছি? কারণ একজন মেয়ে ইনবক্স করেছে—- “মিম্ মি আমার যাবার কোন জায়গা নেই। স্বামীর সাথে ঝামেলা চলছে, আমরা আলাদা আছি বছরখানেক ধরে। বাবার বাড়িতেও আশ্রয় নেই আমার। ভাই বোনেরাও নিত্য কথা শোনাচ্ছে। কি করব কই যাব আমি? সবার চোখে পচে গেছি আমি।
আশা করছি তুমি অন্তত বুঝবা আমার অবস্থাটা। ভীষন অসহায় লাগছে। আশ্রয়ের অভাবে কি সুইসাইড করব আমি ?”
আমার জীবনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য সময় হচ্ছে কর্মজীবি মহিলা হোস্টেলে কাটানো ঐ তিন মাস। ঐ সময়টা আমাকে শিখিয়েছে জীবনে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকাটাই হচ্ছে একমাত্র সত্য কথা। কেউ তোমার পথ তৈরি করে দিবে না। তোমাকে একদম একা একাই নিজের বুদ্ধি বিবেক শিক্ষা রুচি এবং কমন সেন্স দিয়ে নিজের পথটা তৈরি করে নিতে হবে। কর্মজীবি মহিলা হোস্টেলে বেবী এলাও করে না। তারউপরে ছেলে বাচ্চা! আহ………. চোখের পানিই শক্তি হয়ে উঠেছিল আমার জন্য।প্রথম আলো হাতে নিয়ে একের পর এক হোস্টেলে ফোন করে যাচ্ছিলাম।
নিরাপদ একটুখানি মাথা গোঁজার ঠাঁই—আমাকে মানুষ চিনিয়েছে—–আমাকে জীবন দেখিয়েছে।

বাচ্চার কথা শুনে সব হোস্টেল সুপারই না বলে দিচ্ছিলেন। শেষ পর্যন্ত একজন হোস্টেল সুপার আন্টি এবং মালিক পক্ষ যখন শুনলেন আমি ডাক্তার তখন খানিকটা নরম হলেন। তবে শর্ত দিলেন এততততগুলা। আমি সবকিছু মানতে রাজী ছিলাম তখন। অবশেষে চারজনের একটা রুম নিলাম আমি। চারজনের মিল চার্জ, বেড, রুম রেন্ট সবসহ, রুমের সাথে এটাচড বাথরুম, বারান্দা এবং একটা গ্যাসের চুলা দেয়া হলো আমাকে।
আমি তখন শ্যামলির ট্রমা সেন্টারে জব করছিলাম। বাচ্চাটা তখন লন্ডন গ্রেস ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে পড়ছিল। শুরু হলো নতুন এক জীবন।

সিভি ড্রপ করতে শুরু করলাম RMO পদে সারা বাংলাদেশে। ঢাকাতে চাকরির সমস্যা আমার ছিল না। আত্মসম্মানবোধ প্রবল হওয়ায় সমস্যা ছিল থাকার জায়গার। অবশেষে প্রায় তিন মাসের মাথায় ঢাকার বাইরে কোয়ার্টারসহ নিরাপদ একটা জব আমার হয়েই গেল। শুরু হলো আমার নিজস্ব জীবনটার।

কেটে গেছে তিন সাড়ে তিন বছর। বহু ঝড় ঝাপটা ঝুঁকি পাড়ি দিয়ে এখনও ঠিকই shameless এর মতো টিকে আছি। বিপদে যে পড়ি না তা কিন্তু না। তবে বিপদ মোকাবেলা করতেও শিখে গেছি। চরম সত্য জেনেছি——- কপাল খারাপ মেয়ের বিপদ শুধু বাইরেই না, ঘরেও অভাব হয় না বিপদের। তবে সত্যি বলতে কি নিজেকে আমার “কপাল খারাপ মেয়ে” মনে হয় না কখনো; মনে হয় My life is full of Adventure.

——যেই মেয়েটা আমাকে ইনবক্স করেছেন তাকে বলছি—সুইসাইড কোন কাজের কথা না ম্যাডাম। 100% গ্যারান্টি নাই সাকসেস হবার।
উপরওয়ালা না চাইলে মানুষের পক্ষে মরে যাওয়া সম্ভব না।তখন কিন্তু লোকে আপনাকে ছিঁড়ে ফেলবে শব্দবানে।

যেহেতু মাস্টার্সের একটা সার্টিফিকেট আছে আপনার সেহেতু অনুরোধ করছি নিজেকে একবার সুযোগ দিন।জীবনে একটা বার নিজের জন্য একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ই দেখুন না।সমানে সিভি ড্রপ করতে থাকুন সব জায়গায়।মনে রাখবেন—“পরিশ্রম দিয়ে করা কোন ধান্ধা ই (work) ছোট না”।লোকে কি ভাববে তা ভাবার সময় এখন না।পেটে ভাত আর মাথার উপরে ছাদ এই মুহূর্তে আপনার এক নম্বর প্রায়োরিটা।

মানব জীবন হচ্ছে অফুরন্ত সম্ভাবনার ভান্ডার। মনে রাখবেন জীবনে চলার পথে একটা দরজা বন্ধ হয়ে গেলে পাঁচটা দরজা খুলে যাবে। প্রয়োজন শুধু সময় মতো সঠিক দরজাটা খুঁজে বের করা।
আশাহত হবেন না। ধৈর্য ধরুন। যেহেতু আপনি সনাতন ধর্মের সেহেতু নিজের ঈশ্বরের উপর ভরসা রাখুন। প্রার্থনা করুন। সব ঠিক হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।
জীবন খুব সুন্দর।এই যে খারাপ সময়টা এখন কাটাচ্ছেন পরবর্তীতে দেখবেন এই সময়টা শুধু একটা স্মৃতি হয়ে থাকবে।এর থেকে বেশি আর কিছু না।
ভালোবাসা রইলো।