বাংলা সাইটে সরাসরি গুগলের বিজ্ঞাপন: বাড়বে দেশীয় অ্যাপসের বাজার

 

সরাসরি বাংলায় গুগলে অ্যাড দেওয়ার বিষয়টি চূড়ান্ত হওয়ার খবরে দেশীয় অ্যাপসের বাজারে সুবাতাস বইতে শুরু করেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সুবিধা চালু হওয়ায় বাংলা কনটেন্ট বাড়বে, সেখানে অ্যাডসেন্সের অ্যাড থাকবে। ফলে অ্যাপস নির্মাতাদের বিজ্ঞাপনের জন্য আর বসে থাকতে হবে না। তাদের মতে, দেশের তথ্যপ্রযুক্তি পণ্য ও সেবার বাজার আকার ৮০০ মিলিয়নের মতো। এরমধ্যে ২০ ভাগ অ্যাপস, ওয়েবভিত্তিক পণ্য ও সেবার। সেই বাজার বড় হতে শুরু করেছে। গুগলে বাংলা অন্তর্ভুক্তির ফলে আগামী দিনে এই বাজার আরও বড় হবে।


ইন্টারনেট পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বিশ্বে বর্তমানে ৫ মিলিয়নের বেশি তথা ৫০ লাখের বেশি যোগাযোগভিত্তিক ও সেবাধর্মী অ্যাপস রয়েছে। এর মধ্যে গুগল প্লে-স্টোরে ২৮ লাখ ও অ্যাপল (আইওএস) স্টোরে রয়েছে ২২ লাখ অ্যাপস রয়েছে। এর বাইরে আরও অ্যাপস রয়েছে কিছু জায়গায়।

এদিকে অ্যাপস জিনি পোর্টাল জানাচ্ছে, ২০১৬ সাল পর্যন্ত প্লে-স্টোরগুলোয় বাংলাদেশের ডেভেলপারদের তৈরি অ্যাপ ছিল ৩ লাখ। যদিও বর্তমানে তা বেড়েছে বলে জানা গেছে।

দেশীয় অ্যাপসের বাজার, সমস্যা ও সম্ভাবনার বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সভাপতি মোস্তাফা জবব্বার গুগলে সরাসরি বাংলা অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘সব ধরনের ডিজিটাল পণ্য ও সেবার জন্য এটি ভালো হলো।’ আর অ্যাপসের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘যে অ্যাপের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক তৈরি হয় না, তা কখনও সফল হতে পারে না। অ্যাপস তৈরির আগে মানুষের সমস্যা ও প্রয়োজনটা বুঝতে হবে। আমাদের দেশে এসব বিশ্লেষণ করে অ্যাপস তৈরি করা হচ্ছে না বলে সেই মাপের সফলতা আসছে না। অথচ বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে।’

মোস্তাফা জব্বার আরও বলেন, ‘দেশে অ্যাপস বানানোর সময় দেশের মানুষকে অগ্রগণ্য না ভেবে বিদেশকে টার্গেট করা হয়। অথচ দেশে ১৩ কোটি মানুষ মোবাইলফোন ব্যবহার করে। এটাই বিশাল একটা বাজার। নিজেদের বাজার ধরতে পারলেও বড় অভিজ্ঞতা অর্জন হয়। এ ক্ষেত্রে বাংলা অনেক সহায়তা করতে পারে।’

দেশের অ্যাপস বিষয়ে জানতে চাইলে অ্যাপস নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এমসিসি লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী আশরাফ আবীর বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ‘দেশের বেশ কিছু অ্যাপস ভালো করছে। আগামীতে অ্যাপসগুলো আরও ভালো করবে।’ এর পেছনে স্মার্টাফোনের ব্যবহার, ইন্টারনেট গ্রাহক বৃদ্ধিকে কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করে বলেন, ‘দেশে এখনও অ্যাপসের ইকোসিস্টেম তৈরি হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যায়ে অ্যাপস নিয়ে পড়াশোনা শুরু করতে হবে, শিক্ষার্থীদের সমস্যা সমাধানের মানসিকতা থাকতে হবে। ইনোভেটিভ হতে হবে। তাহলেই অ্যাপস নিয়ে ভালো কিছু করা যাবে।’

এমসিসি এ পর্যন্ত দুই শতাধিক অ্যাপ তৈরি করেছেন। এর মধ্যে মীনা, লেট’স ইট, রূপকথা, পুলিশ স্টেশন (থানা) নামের অ্যাপগুলো বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। এর মধ্যে মীনা গেমস তো বেশ কিছুদিন গুগলের টপচার্টে ছিল। আশরাফ আবীর জানালেন, ‘এখন পর্যন্ত গেমটি প্লে স্টোর থেকে সাড়ে চার লাখ বার ডাউনলোড হয়েছে। ব্র্যান্ডনেম, ইউনিসেফের পণ্য, চকচকে ঝকঝকে দৃশ্য, চমৎকার আর্টওয়ার্ক ইত্যাদির কারণে মীনা জনপ্রিয়তা পেয়েছে বলে তিনি জানান। আগামীতে চিলড্রেন প্রোফাইল ও মিট মিনা নামে অ্যাপস আসার কথাও জানা গেল।


শুধু অ্যাপ তৈরি করাই নয়, নিয়মিতভাবে অ্যাপ ডেভেলপ করা, বিপণন করা, গ্রাহকদের বাজেট বরাদ্দ রাখা এবং এর জন্য পৃথক উইং খোলা না হলে সংশ্লিষ্ট অ্যাপ থেকে সুফল পাওয়া যাবে না। বরং এগুলো করা হয় না বলেই অ্যাপ শিল্পটা প্রকৃত অর্থে এখনও শিল্প হয়ে উঠতে পারছে না। 

গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্রেনিউর ল্যাবের প্রধান নির্বাহী আরিফ নেজামী বলেন, দেশের অ্যাপস বাজারের অবস্থা ভালো। এখন থেকে আরও ভালো হবে। গুগলে সরাসরি বাংলা এসে গেছে। বাংলায় প্রচুর কনটেন্ট তৈরি হবে। গুগল অ্যাডসেন্স থেকে আয়ও হবে। আরিফ নেজামী জানালেন, কিছুদিনের মধ্যে দেশীয় অ্যাপের বাজার আকার দ্বিগুণ হয়ে যাবে। যুক্তি হিসেবে তুলে ধরেলেন বাংলার কারণে বাজার বড় হবে। আর ভারতের পশ্চিম বঙ্গের বাজার ধরলে তা এক লাফে দ্বিগুণ হয়ে যাবে। 

তবে প্রেনিউর ল্যাবের প্রধান জানালেন, গুগলের সঙ্গে অ্যাপস বিষয়ক মনেটাইজেশন সমস্যা বড় একটা জটিলতা তৈরি করেছে। গুগল বাংলাদেশে অপারেটর বিলিংয়ের সঙ্গে কানেক্টেড নয়। ফলে অ্যাপ ডেভেলপারদের কোনও মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট নেই। এজন্য অ্যাপস বিক্রিও করা যায় না। আর এ কারণে দেশের ডেভেলপাররা প্লে-স্টোর থেকে কোনও অ্যাপ ডাউনলোড হলে অর্থ পায় না। এই সমস্যা দূর হয়ে গেলে বাংলাদেশের অ্যাপসই একদিন বিশ্ব মাতাবে। 

ইন্টারনেট পর্যালোচনায় দেখ গেছে, দেশীয় প্রতিষ্ঠান রাইজ আপ ল্যাবসের তৈরি ট্যাপ ট্যাপ অ্যান্ট এরই মধ্যে কয়েক কোটিবার ডাউনলোড হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানের তৈরি হাইওয়ে চেজ ছাড়াও অ্যান্ট সিরিজের অন্যান্য অ্যাপও দেশ-বিদেশে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

সম্প্রতি মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় অ্যাপ ‘মুসলিম প্রো’ বিক্রি হয়েছে ৮ ডিজিটের আমেরিকান ডলার অংকে। ধারণা করা হচ্ছে কয়েক কোটি ডলারে বিক্রি হয়েছে অ্যাপটি। সিঙ্গাপুরের সিআইএমএ ক্যাপিটাল পার্টনারস এবং মালয়েশিয়ার আফিন হং অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট যৌথভাবে অ্যাপটি কিনে নিয়েছে।

প্রেনিউর ল্যাব জানায়, বর্তমানে বাংলাদেশে সর্বাধিক ব্যবহৃত অ্যাপগুলো হলো—ফেসবুক, ভাইবার, আইএমও, শেয়ার ইট, ক্ল্যাশ অব ক্ল্যান, হোয়াটসঅ্যাপ, ইউসি ব্রাউজার, অপেরা মিনি, ক্লিন মাস্টার ও এমএক্স প্লেয়ার।

সরাসরি বাংলায় গুগলে অ্যাড দেওয়ার বিষয়টি চূড়ান্ত হওয়ার খবরে দেশীয় অ্যাপসের বাজারে সুবাতাস বইতে শুরু করেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সুবিধা চালু হওয়ায় বাংলা কনটেন্ট বাড়বে, সেখানে অ্যাডসেন্সের অ্যাড থাকবে। ফলে অ্যাপস নির্মাতাদের বিজ্ঞাপনের জন্য আর বসে থাকতে হবে না। তাদের মতে, দেশের তথ্যপ্রযুক্তি পণ্য ও সেবার বাজার আকার ৮০০ মিলিয়নের মতো। এরমধ্যে ২০ ভাগ অ্যাপস, ওয়েবভিত্তিক পণ্য ও সেবার। সেই বাজার বড় হতে শুরু করেছে। গুগলে বাংলা অন্তর্ভুক্তির ফলে আগামী দিনে এই বাজার আরও বড় হবে।