সিনেমা দেখে কান্নাকাটি করেন? গবেষণা জানাচ্ছে আপনি খুব দৃঢ় মানসিকতার মানুষ!

 

বেশীরভাগ সময়ে নয়, বলতে গেলে প্রায় সবসময়ই আমরা তাদেরকে নিয়ে হাসি-ঠাট্টা-তামাশা করি যারা সিনেমার কোন আবেগপূর্ণ দৃশ্য দেখে কান্নাকাটি করা শুরু করে দেন। এই ব্যাপারটা আমাদের কাছে খুব মজার বলে মনে হয় এবং আমরা ধরেই নেই, যে ব্যক্তি সামান্য একটা সিনেমা দেখে কান্নাকাটি করে বসে, সে অবধারিতভাবেই খুবই দূর্বল মানসিকতার একজন মানুষ। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে, যে ব্যক্তি সিনেমা-নাটক অথবা কোন বই পড়ে কান্নাকাটি করেন তিনি খুবই মানসিকভাবে খুবই শক্ত এবং দৃঢ় হয়ে থাকেন! শুধু তাই নয়, তার মাঝে থাকে প্রচুর পরিমাণে সহমর্মিতা এবং সহানুভূতিশীলতা।


সোশিয়প্যাথ কিংবা নার্সিসিষ্ট এর মতো এমন অনেক মানুষই আছেন যারা কখনোই অন্যের দুঃখ-কষ্টকে বুঝতে পারেন না, তাদের মাঝে কোনভাবেই কারোর প্রতি কোন সহানুভূতির জন্ম হয় না। বহুল প্রচলিত একটি ইংলিশ প্রবাদ বাক্য আছে- "শুধুমাত্র অন্যের জুতা পায়ে দিয়ে হাঁটলেই তার অবস্থা বোঝা সম্ভব হয়।" এই কথাটি এমন মানুষদের ক্ষেত্রে একেবারেই যায় না।  তারা অন্যের কোন সমস্যা, অন্যের কষ্ট কিংবা মানসিক অশান্তি একেবারেই বুঝতে পারেন না।

অন্যদিকে, অপরের ব্যাপারে কেয়ার করা, তাদের অনুভুতিগুলো বুঝতে পারার জন্যে অনেক বেশী মানসিক শক্তির প্রয়োজন হয়ে থাকে। জীবন প্রতিটি মানুষের জন্যে হয়ে থাকে একেবারেই ভিন্ন। একেক সময়ে একেক জনের জন্য জীবনে একেক রকম ঘটনা নিয়ে উপস্থিত হয়। প্রতিটা মানুষের জীবনের সুখ কিংবা দুঃখ কষ্টের ঘটনাগুলো নিজের মাঝে ধারণ করা, বুঝতে পারা, তাদের কষ্টকে অনুভব করার জন্যে নিজেকে অনেক বেশী শক্ত হতে হয় মানসিকভাবে।

এখন এত কথার পরে কেউ প্রশ্ন করতেই পারেন যে কেন সিনেমা দেখেই কান্নাকাটি কেউ করবে? বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটা হয়ে থাকে ফিকশন মূলক কোন গল্প, যেখানে টাকার বিনিময়ে অভিনেতারা অভিনয় করছেন। এই সকল কিছু জানার পরেও কেউ কান্নাকাটি করেন তারা?

'নিউরোপেপটাইড অক্সিটোসিন' সহমর্মিতার মড্যুল হিসেবে কাজ করে থাকে। মস্তিষ্ক থেকে নিঃসৃত হওয়া অক্সিটোসিন মূলত অন্যের ব্যাপারে কেয়ার করার অনুভূতি নিয়ে কাজ করে, এমনকি সেটা হতে পারে একেবারেই অপরিচিত কারোর ব্যাপারেও। মস্তিষ্ক থেকে কেন বা কী কারণে অক্সিটোসিন নিঃসৃত হয় সেটা বের করতে নিউরো-ইকোনমিস্ট পল জে. জ্যাক এর গ্রাজুয়েট ছাত্র জর্জ বারাজ কিছু অংশগ্রহণকারীদের সাথে একটি পরীক্ষা করেন মেমফিজে অবস্থিত সেন্ট জুড চিলড্রেন হসপিটালে। অংশগ্রহণকারীদের মাঝে একদলকে একটি ভিডিও ক্লিপ দেখানো হয় যেখানে, একজন বাবা তার চার বছরের ছেলে বেন এর টার্মিনাল ব্রেন ক্যান্সার নিয়ে কথা বলছেন। অন্যদলকে দেখানো হয়, বাবা এবং বেন একসাথে চিড়িয়াখানায় ঘুরছেন।

নিউইয়র্ক একাডেমী অফ সাইন্সে উক্ত গবেষণার ফল প্রকাশিত করে, যারা ভিডিওর অনেক বেশী আবেগপূর্ণ দৃশ্য দেখেছে তাদের রক্তে অক্সিটোসিন এর মাত্রা ৪৭% পর্যন্ত বেড়ে গেছে। মন খারাপ ভাব আয়ত্তে আনার জন্যে সহমর্মিতার সাথে অক্সিটসিনের মাত্রা বেড়ে যাবার যোগাযোগ রয়েছে। যা প্রমাণ করে যে, অক্সিটোসিন হলো মানসিক সহমর্তিতা প্রকাশের একটি রূপ!

এটা তো শুধুমাত্র আবেগের ব্যাপার গেলো, টাকাপয়সা কিংবা বস্তুগত ব্যাপারেও তারা কতোটা উদারতা দেখান সেটাও কিন্তু দেখার বিষয় ছিল। অংশগ্রহণকারীদের মাঝে যারা আবেগপূর্ণ দৃশ্য দেখেছিলেন, তাদের মাঝে নিজেদের কষ্টার্জিত টাকা দান করে দেবার প্রবণতা দেখা দেয় এবং তারা নিজেদের টাকা দান করে দেন একেবারেই অপরিচিত, অচেনা অসুস্থ মানুষদের মাঝে যাদের কাছ থেকে তারা কখনো সামান্য ‘ধন্যবাদ’ টাও পাবেন না। কারণ, পুরো প্রক্রিয়াটাই সম্পন্ন হয় কম্পিউটারের মাধ্যমে! 

যে কারণে অনেক বেশী আবেগী ধরণের মানুষগুলো বাস্তবিক ক্ষেত্রে খুবই ভালো মনের মানুষ হন। কাছের মানুষ এবং প্রিয় মানুষদের প্রতি তারা খুবই যত্নবান হয়ে থাকেন। চারপাশের সকলের ব্যাপারেই তারা অনেক খেয়াল রাখতে এবং সাহায্য করতে চেষ্টা করেন। যেহেতু তারা অন্যকে বুঝতে পারেন, অন্যের ভাল-খারাপ অবস্থাকে বুঝতে পারেন, সেহেতু তারা বন্ধু কিংবা টিম লিডার হিসেবেও খুবই চমৎকার হোন।

অন্য আরেকটি গবেষণা থেকে দেখা গেছে যে, ৯২ শতাংশ মানুষ অন্তত একটা সিনেমার দেখার সময়ে কান্নাকাটি করে থাকেন। যদিও অনেক মানুষ এখনও সিনেমা দেখার সময়ে কান্নাকাটি করাটাকে দুর্বলতা বলে ধরে নেয়।

আবেগপূর্ণ মানুষগুলো খুবই খোলা মনের হন বলেই তারা তাদের আবেগকে লুকিয়ে রাখতে পারেন না বা চানও না। তারা তাদের আবেগের জন্য লজ্জিত কিংবা অপ্রস্তুতও বোধ করেন না। যেখানে এখনকার সময়ের সকলেই নিজেদের আবেগকে লুখিয়ে রাখতে চেষ্টা করেন, লুকিয়ে রাখতে চান সেখানে এই মানুষগুলো নিজেদের কাছে তো বটেই সকলের কাছেই একদম স্বচ্ছ থাকেন নিজেদের আবেগের ব্যাপারে।

বেশীরভাগ সময়ে নয়, বলতে গেলে প্রায় সবসময়ই আমরা তাদেরকে নিয়ে হাসি-ঠাট্টা-তামাশা করি যারা সিনেমার কোন আবেগপূর্ণ দৃশ্য দেখে কান্নাকাটি করা শুরু করে দেন। এই ব্যাপারটা আমাদের কাছে খুব মজার বলে মনে হয় এবং আমরা ধরেই নেই, যে ব্যক্তি সামান্য একটা সিনেমা দেখে কান্নাকাটি করে বসে, সে অবধারিতভাবেই খুবই দূর্বল মানসিকতার একজন মানুষ। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে, যে ব্যক্তি সিনেমা-নাটক অথবা কোন বই পড়ে কান্নাকাটি করেন তিনি খুবই মানসিকভাবে খুবই শক্ত এবং দৃঢ় হয়ে থাকেন! শুধু তাই নয়, তার মাঝে থাকে প্রচুর পরিমাণে সহমর্মিতা এবং সহানুভূতিশীলতা।