নখ কামড়ানোর অভ্যাস নিয়ে যা জানান মনোবিজ্ঞানীরা

How-did-the-Sophiarobot-woman-without-being-a-Muslim-and-without-hijab-Saudi-Saudi-Arabia 


ছোট থেকে বড় সকলের মাঝেই সাধারণ যে বৈশিষ্ট্যটা কমবেশি দেখা যায় সেটা হলো ‘নখ কামড়ানো’র অভ্যাস। বেশিরভাগ মানুষ এই অভ্যাসটিকে মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তা দূর করার অন্যতম একটা পন্থা হিসেবে মনে করলেও অনেক মানুষ নখ কামড়ানোর অভ্যাসকে ‘পারফেকশনিজম’ এর লক্ষণ হিসেবেও অভিহিত করে থাকেন। পরিসংখ্যান এর হিসেব মতে, এক-তৃতীয়াংশ মানুষ বড় হবার পরেও নখ কামড়ানোর অভ্যাসকে পরিত্যাগ করতে পারেন না।


নখ কামড়ানো কে বলা হয়ে থাকে Onychophagy. যেটা BFRB এর একটি অন্যতম উদাহরণ। BFRB এর পূর্ণ রূপ হলো ‘Body focused repetitive behavior.’ সবসময় মুখের যে কোন ধরণের ব্যবহার অথবা মুখের দ্বারা যেকোন কাজে ব্যস্ত থাকার মাধ্যমে এর প্রকাশ পেয়ে থাকে। 

নখ কামড়ানোর অভ্যাস মানসিক দুশ্চিন্তার জন্যে হোক অথবা পারফেকশনের জন্যে হোক, এটি মানসিক এবং শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্য কোনভাবেই ভালো নয়। অতিরিক্ত নখ কামড়ানোর ফলে হাতের নখ দেখতে খুবই বাজে হয়ে যায় এবং নানান ধরণের অসুখের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। একই সাথে এটা কারোর ব্যক্তিত্বের এমন কিছু বৈশিষ্ট্য নির্দেশ করে যা সম্পর্কে সে সচেতন নয়। তারই কিছু দিক তুলে ধরা হলো।

১/ নিজেকে কখনোই সুস্থির হওয়ার সুযোগ না দেওয়া

বেশ কিছু গবেষণা থেকে দেখা গেছে যে, অনবরত নখ কামড়ানোর পেছনে থাকে মানসিক কোন অশান্তি। একটি পরীক্ষামূলক গবেষণা থেকে দেখা গেছে যে নখ কামড়ানোর পেছনে থাকে নেতিবাচক অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতা।

অন্য আরেকটি গবেষণা জানাচ্ছে- অবসাদ, হতাশা, ব্যর্থতা এবং দুশ্চিন্তা থেকে এমন ধরণের আচরণ প্রকাশ পায়। যার মানে দাঁড়ায়, পূর্নবয়স্ক কেউ নখ কামড়ালে তার পেছনে রয়েছে এমন কোন নেতিবাচক অনুভূতি বা ঘটনা যেটা তিনি প্রকাশ করতে পারছেন না। যার ফলে তিনি কখনোই মানসিকভাবে শান্তিতে থাকতে পারছেন না। যেটা প্রকাশ পাচ্ছে তার নখ কামড়ানোর মাঝে।

২/ অতিরিক্ত খুঁতখুঁতে অথবা ‘পারফেকশনিষ্ট’ হওয়া

এখনকার সময়ের মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, যাদের মাঝে BFRB এর লক্ষণ সমূহ দেখা যায় তারা অতিরিক্ত খুঁতখুঁতে স্বভাবের হয়ে থাকেন। যখন কোন কাজ পারফেকশনিষ্টদের মনমতো হয় না এবং তাদের পছন্দ অনুসারে ঘটে না তখন তারা খুব ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন এবং তারা মোটেও শান্ত থাকতে চান না। তারা ক্ষোভ পুরোপুরিভাবে প্রকাশ করতে পারেন না বলে সেটা তাদের কার্যকলাপের ভেতর দিয়ে প্রকাশিত হয়ে থাকে। যেখান থেকেই নখ কামড়ানোর মতো অভ্যাসটি তাদের মাঝে দেখা দেয়। তারা যখন অসন্তুষ্ট হন, তখন নখ কামড়ানোর মাধ্যমে নিজেদের তারা শান্ত রাখতে চান। 

৩/ নখ কামড়ানোর ব্যাপারে অসচেতন হওয়া

বেশীরভাগ সময়ে যারা নখ কামড়ানোর ব্যাপারে অভ্যাস্ত হয়ে পড়েন তারা বুঝতে পারেন না যে কখন তারা নিজেদের অজান্তেই মুখের কাছ হাত নিয়ে যান! এটা ছোট অথবা বড় যে কারোর সাথেই ঘটতে পারে। কোন একটা কারণ নিজের বেখেয়ালে বা মনের ভুলে মুখের কাছে হাত নিয়ে যাওয়ার পর তারা অনবরত নখ কামরাতে থাকেন। অনেকক্ষেত্রেই তারা বুঝতে পারেন না যে কখন নখ কামড়ানো বন্ধ করা উচিৎ! সময়ের সাথে সাথে এই অভ্যাস আরো অনেক প্রকট আকার ধারণ করতে শুরু করে।

৪/ মুক্তি পাওয়ার অন্যতম কৌশল

পুর্নবয়স্কদের তুলনায় সাধারণত ছোটদের মাঝে নখ কামড়ানোর প্রবণতা এই কারণের জন্য বেশী লক্ষ্য করা যায়। শিশু এবং কিশোররা তাদের হতাশা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য নখ কামড়ানোর মতো অভ্যাস গড়ে তোলে। অনেক মা-বাবারা তাদের সন্তানদের যথাযথ সময় দিতে পারেন না, তাদের সমস্যা অথবা সমস্যার সমাধান নিয়ে আলোচনা করার মতো সময় দিতে পারে না। যেক্ষেত্রে তাদের সন্তানদের মাঝে নখ কামড়ানোর প্রবণতা বেশী দেহ যায়। কারণ তাদের সন্তানেরা তাদের মনের রাগ, ক্ষোভ, হতাশা প্রকাশ করে থাকে নখ কামড়ানোর মাধ্যমে। এছাড়াও দেখা গেছে- স্কুলে পক্ষপাত দুষ্ট শিক্ষক, অন্যান্য ছাত্রদের কটূক্তির শিকার যারা হয়ে থাকে তারাও নখ কামড়ানোর অভ্যাস গড়ে তোলে।

৫/ অনুকরণীয় অভ্যাস

বড়দের নখ কামড়ানোর অভ্যাস দেখে ছোটদের মাঝেও এই অভ্যাস সংক্রমিত হয়। যেহেতু ছোটরা বড়দের দেখে সকল কাজ শেখে এবং সেভাবেই করতে চায়, সেহেতু একজন শিশু তার পরিচিত অথবা কাছের কারোর নখ কামড়ানোর অভ্যাস দেখলে সেটা তার নিজের মাঝেও কাজ করা শুরু করে। সেও তার অবচেতনে নখ কামড়ানোর মতো অভ্যাসের সাথে জড়িয়ে পরে। Onychophagy এর অভ্যাস সাধারণ অল্প বয়স থেকেই তৈরি হয় এবং বয়স বাড়ার পরেও এই অভ্যাস বাদ দেওয়া কষ্টকর হয়ে যায়।

৬/ নিজেকে আঘাত করা অথবা ব্যথা দেওয়া

দুঃখজনকভাবেই এখনকার সময়ে কম বয়সী ছেলেমেয়েদের মাঝে নিজেদের ব্যথা দেওয়ার অথবা ‘সেলফ-হার্ম’ এর প্রবণতা বেশী দেখা যায়। এমনকি অনেক সেলিব্রিটিদের মাঝেও এই প্রবণতা চোখে পরে। একই সাথে যাদের নখ কামড়ানোর অভ্যাস রয়েছে তাদের মাঝেও সেলফ-হার্ম এর প্রবণতা থাকে। যেটা অনেকটাই মনো-দৈহিক একটি ব্যাপার। যেটা সম্পর্কে তারা নিজেরাও অসচেতন থাকেন।

৭/ আবেগ অনুভূতির তীব্রতা প্রকাশ

মানসিক অশান্তি এবং চাপের সাথে অতিরিক্ত লাজুক ভাব যাদের মাঝে থাকে তাদের মধ্যে নখ কামড়ানোর অভ্যাস দেখা দেয়। অনেক সময় তাদের আত্মবিশ্বাসে চির দেখা দেয় অনেক বেশী খোঁটা এবং অযাচিত মন্তব্য শোনার ফলে। এমন বাজে আচরণ তাদের পরিবার, বন্ধু, সহপাঠী, সহকর্মি অথবা জীবনসঙ্গীর কাছ থেকে হতে পারে।

৮/ ডিসঅর্ডার এর একটি অংশ

পূর্বের একটি পয়েন্টে উল্লেখ করা হয়েছে, শিশুরা অনুকরণ প্রিয় হয় বলে তারা বড়দের দেখে নখ কামড়ানোর অভ্যাসটি রপ্ত করে থাকে। কিন্তু আঠারো বছরের পরে যদি কেউ নখ কামড়ানোর অভ্যাসটি গড়ে তোলে তবে সেক্ষেত্রে এই অভ্যাসটি কে কোনোভাবেই অনুকরণীয় অভ্যাস বলা যাবে না। মনোবিজ্ঞানীরা ১৮ বছরের পরে এমন অভ্যাসকে ‘অ্যাংজাইটি ডিসর্ডার’ হিসেবে অভিহিত করে থাকেন।

৯/ বিরক্ত হওয়া ফলে নখ কামড়ানো

সকল কথা পড়ার পরে নিশ্চয় অনেকেই ভয় পাচ্ছেন নখ কামড়ানোর অভ্যাসটি নিয়ে। তবে এটা অনেক সময় বিরক্তি থেকেও দেখা দিতে পারে। কোন বিরক্তিকর পরিবেশে, অথবা কাজের মাঝে অনেকেই আনমনে নিজের আঙ্গুল মুখে দিয়ে নখ কামড়াতে থাকেন। এছাড়াও, অনেক বেশী বিচলিত বোধ করলে ও বিরক্তি বোধ করলে প্রচণ্ড ঘুম পায়। এই ঘুম তাড়াতে ও নার্ভ সিস্টেমকে সজাগ রাখতেও নখ কামড়ানো কাজে দেয় বলে অনেকেই নখ কামড়ানোর অভ্যাস গড়ে তোলে।

সকল কথার শেষে বলা যায় নখ কামড়ানোর অভ্যাস, মানসিক অস্থিরতা ও সমস্যা কে দূরে রাখার জন্যে গড়ে ওঠে। তবে এটা কোনোভাবেই মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্য ভালো নয়। কারণ আমরা আমাদের হাত দিয়েই সকল ধরণের কাজ করি। বিধায় মুখে হাত দেওয়ার সাথে সাথে বহু ধরণের জীবাণু আমাদের শরীরে প্রবেশ করছে। নখ কামড়ানোর অভ্যাসকে দূর করার জন্য হাতে সবসময় কোন ধরণের বস্তু রাখলে উপকার পাওয়া যায়। এক্ষেত্রে রুবিক’স কিউব অথবা ফিজেট স্পিনার খুব দারুণ কাজে দেয়।

ছোট থেকে বড় সকলের মাঝেই সাধারণ যে বৈশিষ্ট্যটা কমবেশি দেখা যায় সেটা হলো ‘নখ কামড়ানো’র অভ্যাস। বেশিরভাগ মানুষ এই অভ্যাসটিকে মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তা দূর করার অন্যতম একটা পন্থা হিসেবে মনে করলেও অনেক মানুষ নখ কামড়ানোর অভ্যাসকে ‘পারফেকশনিজম’ এর লক্ষণ হিসেবেও অভিহিত করে থাকেন। পরিসংখ্যান এর হিসেব মতে, এক-তৃতীয়াংশ মানুষ বড় হবার পরেও নখ কামড়ানোর অভ্যাসকে পরিত্যাগ করতে পারেন না।