স্বপ্নের চাকরি ছেড়ে প্রাণীর সেবায়

 

 চারপাশে বিভিন্ন ধরনের ঘটনা-দুর্ঘটনার সঙ্গে নির্মমতা ও নিষ্ঠুরতা যেন প্রতিদিনের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষের পাশাপাশি এর প্রভাব পড়ছে অবলা পশুদের ওপরও। কিন্তু নানা সমস্যায় জর্জরিত মানুষের পশুদের দেখার সময় কোথায়! এর পরও ব্যতিক্রমী মানুষ সব সময়ই ছিলেন। তাদের একজন নেহা পাঞ্চমিয়া।


ভারত, যুক্তরাজ্যে পুষ্টিবিজ্ঞান নিয়ে পড়ালেখা করে লোভনীয় চাকরি পেয়েছিলেন এই নারী। কিন্তু প্রাণীর প্রতি মমত্ব তাকে সেই চাকরি ছেড়ে দিয়ে প্রাণী উদ্ধারকারী একটি সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা করেছে। তার সংগঠন 'ResQ' এখন ভারতে অযত্নে থাকা ও বেওয়ারিশ প্রাণীর সেবার অন্যতম নির্ভরযোগ্য আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

ভারতের মুম্বাই শহরে জন্ম ও বেড়ে ওঠা নেহার। পরিণত বয়সে পরিবারের সঙ্গে পুনেতে চলে যান তিনি। এর পর ভারতে পুষ্টিবিজ্ঞানে স্নাতক করে উচ্চ শিক্ষার জন্য যান যুক্তরাজ্যে। সেখানে মেডিকেল সায়েন্স ইন হিউম্যান নিউট্রিশনে স্নাতকোত্তর শেষ করেন তিনি।

পড়ালেখা শেষ হতেই নামী একটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে চাকরি পান নেহা। কিন্তু সেখানে বেশি দিন মন টেকেনি তার। স্বপ্নকে সত্যি করতে নিজেকে পুরোপুরি নিয়োজিত করেন প্রাণীর সেবায়।

নেহার বাবা-মা ছিলেন উদ্যোক্তা। মেয়ের এহেন সিদ্ধান্তে তারা যারপরনাই অবাক হয়েছিলেন। সে সময় বাবা-মাকে আশ্বস্ত করে নেহা জানিয়েছিলেন, প্রাণীর সেবার পাশাপাশি নতুন ব্যবসাও শুরু করবেন তিনি।


ভালো বেতন ও নামী প্রতিষ্ঠান ছেড়ে কেন প্রাণীপ্রেমে নিজেকে নিয়োজিত করলেন-সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে এমন প্রশ্ন করা হয়েছিল নেহাকে। উত্তরে তিনি জানান,সেই ভালোবাসার শুরুটা শৈশবেই। ১৬ বছর বয়সে তাদের বাসায় একটি কুকুরকে রাস্তা থেকে তুলে আনা হয়েছিল। আহত সেই কুকুরটি তিন পা ব্যবহার করে হাঁটতে পারত। তার নাম রাখা হয় টফি।  অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে যায় সেই টফি।

‘টফি শুধু একটি পালিত কুকুরের শখই পূরণ করেনি, একই সঙ্গে আমাকে বুঝতে সাহায্য করেছে যে. পশুদের কষ্ট আমি একেবারেই সহ্য করতে পারি না’,  বলেন নেহা।

২০০৬ সালে পুনে চলে আসার সময় অসুস্থ-অসহায় পশুদের দেখভালের বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন নেহা। পরের বছর ২০০৭ সালে তানিয়া কানে  নামের পরিচিত এক নারীর কাছ থেকে অসুস্থ কুকুরের বিষয়ে একটি কল পান তিনি।  সে সময় দুঃখজনকভাবে তানিয়ার কুকুরটিকে বাঁচানো যায়নি।

পরবর্তী সময়ে নেহার বন্ধু বনে যাওয়া তানিয়া সেদিন কোনো পশুচিকিৎসক পাননি, ডেকেছিলেন নেহাকে। কিন্তু প্রিয় প্রাণীটিকে বাঁচানো যায়নি। আর সেই আক্ষেপ থেকেই দুজনে মিলে প্রতিষ্ঠা করেন রেসকিউ।

প্রতিদিনিই বিভিন্ন পশুর সমস্যা নিয়ে অন্তত ৫০টি রিপোর্ট পায় রেসকিউ। সংগঠনটির অন-সাইট এবং সেন্টার কোঅর্ডিনেশন টিম প্রতিদিন ২৫০টির বেশি পশুর যত্ন করে।

বর্তমান আট শতাধিক পশুর দেখভাল করছে রেসকিউ। ভবিষ্যতে পশুদের অস্ত্রোপচার সেবা চালুর ইচ্ছা আছে সংগঠনটির।

নিজের কাজ নিয়ে নেহা বলেন, ‘আমাদের মূল লক্ষ্য হলো মানুষ ও প্রাণীর মধ্যে তৈরি হওয়া সমস্যা কমিয়ে আনা, শহুরে পরিবেশের মানুষকে পশুর প্রতি সহানুভূতিশীল হতে এবং দায়িত্বশীল হয়ে উঠতে সাহায্য করা।’


তবে শুরুর পথটি মসৃণ ছিল না বলে জানিয়েছেন নেহা। সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, প্রতিদিনই মানুষের খোঁটা শুনতে হতো তাকে। অনেকেই তার আগ্রহের জায়গাটিকে নেহায়েৎ  ‘শখের কাজ’ হিসেবে ব্যঙ্গ করত। কিন্তু তাকে থোড়াই কেয়ার করেছেন নেহা। আর এ কারণে হাঁটি হাঁটি পা পা করে তার এই সংগঠন এরই মধ্যেই পার করেছে ১০টি বছর।

প্রাণীদের নিয়ে কাজ করতে গিয়ে ঘটা ছোট্ট একটি ঘটনা স্মরণ করে নেহা জানান, তিন সন্তানের এক মা একদিন তাকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে বলছিলেন, ‘তুমি যদি পশুদের এতই ভালোবাসো, তাহলে রাস্তার সব পশুকে নিজের ঘরে এনে রাখছ না কেন?"

কালক্ষেপণ না করে পাল্টা প্রশ্ন করেছিলেন নেহা। বলেছিলেন, ‘তুমি তো বাচ্চাদের অনেক ভালোবাসো। তাহলে রাস্তার সব বাচ্চাগুলোকে নিজের ঘরে এনে রাখছ না কেন ‘

বিভিন্ন প্রাণীর প্রতি অন্যায় ও অবিচার নিয়ে নেহা বলেন, ‘প্রথমত, যারা প্রাণীদের প্রতি সদয় নন, তারা অন্য মানুষদের প্রতিও কখনো সদয় হতে পারেন না। দ্বিতীয়ত, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে যারা পশুর প্রতি নির্দয় আচরণ করে থাকেন, তাদের অতীত জীবনে কোনো না কোনো দুর্ঘটনা ও সমস্যা থাকেই।’

নেহা মনে করেন, তার কাজ সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবেই।  তিনি মনে করেন, একটা সময়ে তার প্রতিষ্ঠিত রেসকিউ হবে সব প্রাণীপ্রেমীর আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতীক।

চারপাশে বিভিন্ন ধরনের ঘটনা-দুর্ঘটনার সঙ্গে নির্মমতা ও নিষ্ঠুরতা যেন প্রতিদিনের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষের পাশাপাশি এর প্রভাব পড়ছে অবলা পশুদের ওপরও। কিন্তু নানা সমস্যায় জর্জরিত মানুষের পশুদের দেখার সময় কোথায়! এর পরও ব্যতিক্রমী মানুষ সব সময়ই ছিলেন। তাদের একজন নেহা পাঞ্চমিয়া।