'পার্পল ড্রিম'- খারদুংলা টপ! ১৮,৩৮০ ফুট! (পর্ব ৩০)

'পার্পল ড্রিম'- খারদুংলা টপ! ১৮,৩৮০ ফুট! (পর্ব ৩০) 


যেদিন খারদুংলা পাস যাবো সেদিন ভোরে ঘুম থেকে ওঠার পর থেকে মনের মধ্যে কিছুটা আতঙ্ক কাজ করছিল এই জন্য যে মানালি থেকে আসার সময় সারচুতে সারারাত অনেক কষ্ট পেয়েছিলাম হাই এলটিচিউড সিকনেস এর কারণে (মাথা ব্যথা, খাবারে অরুচি, শীত আর উচ্চতা জনিত কারণে) সারচুর উচ্চতা ছিল ১৩০০০ ফুটের উপরে কিন্তু খারদুংলার উচ্চতা তো তার চেয়েও প্রায় ৫০০০ ফুট বেশী!! তাই আবারো না তেমন অসুস্থতা দেখা দেয়। তাহলে ঠিক সারচু থেকে লেহ আসার রাস্তা আর চারপাশ যেমন উপভোগ করতে পারিনি, ঠিক তেমনই এখানেও হলে খুব বেশী মন খারাপ হবে।     


কিন্তু নাহ, শেষ পর্যন্ত লেহ থেকে ধীরে ধীরে রুক্ষ পাহাড় বেয়ে উপরে ওঠার সাথে সাথে বামের চারপাশের পাথর আর মাটির পাহাড়ের মাঝে অপরূপ সবুজ গ্রাম দেখে আর কোন খারাপ লাগা হয়নি। পাশাপাশি একটা জায়গায় এসে ব্রেক দিল নিজেদের উচ্চতার সাথে মানিয়ে নিতে আর ফটোসেশন করতে। আহ কি দারুণ একটা জায়গা সেটা। ঠিক যেন পাহাড়ের কাঁধের উপরে দাঁড়িয়ে আমরা। যার নিচে পাহাড়, উপরে পাহাড়, সামনে পাহাড়, পিছনে পাহাড়, কাছে পাহাড়, আর দূরে চারদিক থেকে বরফের পাহাড়! পাথর-মাটি আর সাদা পাহাড়ে সকালের প্রথম সূর্যের আলো পড়ে একদম বর্ণীল রঙে সেজে ছিল পুরো পাহাড়ে সারি গুলো! পুরোটাই এক বর্ণীল পাহাড়ের সমারোহ।

প্রায় ৩০ মিনিট সময় নিয়েছিলাম সেখানে। আর কোন রকম কষ্ট বা মাথা ব্যাথা না হওয়াতে, তখনই বুঝতে পারলাম লেহতে প্রায় দুই দিন থাকার কারণে আমরা সবাই উচ্চতার সাথে মানিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছি। কারোই কোন সমস্যা আর হলনা। বেশ ভালো ভাবেই দারুণ উদ্যম নিয়ে সবাই পৌঁছে গেলাম পৃথিবীর অন্যতম যান চালিত উঁচু রাস্তার চুড়ায়, খারদুংলা টপ এ! (১৮৩৮০ ফুট!) উচ্চতায়। যেটা অনেকটা স্বপ্নের মত শুধু আমাদের কেন আমাদের মত এমন সমতলের বহু মানুষের কাছেই।

আর আল্লাহর কি অসীম আশীর্বাদ যে আমরা খারদুংলা টপে পৌঁছানো মাত্র আমাদেরকে স্বাগত জানাতে ঠিক তখনই শুরু হল তুষারপাত! যেটা কোন সুদূরতম কল্পনাতেও ছিলনা। আমাদের অনেকের কাছে খারদুংলাই তাদের প্রথম বরফ দেখার, বরফ ছোঁয়ার আর বরফে হাঁটার অভিজ্ঞতা! আর সেই সাথে বাড়তি পাওনা হিসেবে সবাই মিলেই পেলাম জীবনের প্রথম তুষারপাত! আনন্দে আর উত্তেজনায় খেই হারিয়ে বরফের উপরে উঠতে গিয়ে আমি তো একদম ধপাস করে পরে গেলাম শত শত বছর ধরে বরফ পড়ে জমে গিয়ে শক্ত জমাট বরফের উপরে! উহ সে যে কি ব্যাথা লেগেছিল বলে বোঝাবার নয় আদৌ! কয়েক মিনিট পরে তিনজনের টেনে ধরে তুলতে হয়েছিল আমাকে!

এরপর শুরু হল ছবি তোলার পালা। এভাবে, ওভাবে, হেঁটে-হেঁটে, দাঁড়িয়ে, বসে, শুয়ে, চিৎ হয়ে, কাৎ হয়ে, পতাকা ধরে, মাথায় নিয়ে, পিঠে বেঁধে আরও যে কত উপায়ে সব বলে শেষ করা যাবেনা! এখানে সেখানে দৌড়ে ঝাঁপ দিয়ে ছবি তুলতে তুলতে ঘণ্টা প্রায় পেরিয়ে যেতে আমাদের ড্রাইভার বেশ নাখোশ হয়ে পড়লেন, এতো ঠাণ্ডায় আর হুট করে শুরু হওয়া তুষারপাতের গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে গেলে সমস্যা হবে। এই ঠাণ্ডায় একবার ইঞ্জিন বসে গেলে আর চালু করা মুশকিল!

তবুও প্রথম বরফ পড়তে দেখার অসীম আনন্দে ড্রাইভারের কথা উপেক্ষা করেই আমরা সবাই মিলে দারুণ উৎসাহ নিয়ে চা খেতে গেলাম আর্মিদের ক্যাফেটেরিয়ায়। সেখানে গিয়ে গরম চা নিয়ে দাম দিতে গিয়ে ভীষণ অবাক হলাম এই যেনে যে চা এখানেও মাত্র ১০ রুপী! এটা শুনে এক কাপের জায়গায় দুই কাপ না খেলে কি আর বাঙালির মর্যাদা রাখা হয়! তাই দুই কাপ অচিরেই।

এরপরেও গাড়িতে উঠতে উঠতেও আরও কয়েকটা ক্লিক ক্লিক করতে করতেই উঠলাম। কিন্তু গাড়িতে উঠে দেখি দুইজন এখনো দূরে ছবি তোলায় দারুণ ব্যস্ত! তাদেরকে বেশ ঝাড়িটারি দিয়ে গাড়িতে তুলে আবার শুরু হল পথ চলা। ভয়ানক বরফে ঢাকা, পিচ্ছিল খাদের কিনারা থেকে পাথুরে রাস্তা ধরে নুব্রাভ্যালীর দিকে।

পিছনে ফেলে অনেক আনন্দের আর দারুণ অর্জনের পৃথিবীর অন্যতম উঁচু রাস্তার রোমাঞ্চ জয় করে। খারদুংলা টপ ১৮৩৮০ ফুট! আহ পূর্ণ হল পাঁচ বছর ধরে লালিত স্বপ্নের প্রায় ৫০ শতাংশ! জীবনকে আরো একবার সার্থক মনে হল। মনে হল আসলেই মন থেকে চাইলে আর সেই চাওয়ার পিছনে শ্রম দিয়ে অপেক্ষা করলে একদিন না একদিন চাওয়া পূরণ হবেই। শুধু একটু ধৈর্য ধরতে হয় কষ্ট করে আর এগিয়ে যাবার মানসিকতা রাখতে হয় নানা বাঁধা বিপত্তিকে পাশ কাটিয়ে।

মোটকথা প্রত্যয় থাকলে পূর্ণতা আসবেই। লক্ষ্য অটুট রেখে হৃদয়ে বিশ্বাসটা রেখেছিলাম তাই আজ দেখা হল, ছোঁয়া হল আর প্রাণভরে উপভোগ করা হল খারদুংলা টপ, পৃথিবীর উচ্চতম একটি রাস্তা।

যেদিন খারদুংলা পাস যাবো সেদিন ভোরে ঘুম থেকে ওঠার পর থেকে মনের মধ্যে কিছুটা আতঙ্ক কাজ করছিল এই জন্য যে মানালি থেকে আসার সময় সারচুতে সারারাত অনেক কষ্ট পেয়েছিলাম হাই এলটিচিউড সিকনেস এর কারণে (মাথা ব্যথা, খাবারে অরুচি, শীত আর উচ্চতা জনিত কারণে) সারচুর উচ্চতা ছিল ১৩০০০ ফুটের উপরে কিন্তু খারদুংলার উচ্চতা তো তার চেয়েও প্রায় ৫০০০ ফুট বেশী!! তাই আবারো না তেমন অসুস্থতা দেখা দেয়। তাহলে ঠিক সারচু থেকে লেহ আসার রাস্তা আর চারপাশ যেমন উপভোগ করতে পারিনি, ঠিক তেমনই এখানেও হলে খুব বেশী মন খারাপ হবে।