আবারও ‘ব্যবসায়ী গ্রাহকদের’ জন্য দাম কমলো ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথের

 

ব্যবহারকারী পর্যায়ে ইন্টারনেট গ্রাহকদের কোনও সুখবর না দিয়ে ফের ব্যবসায়ী গ্রাহকদের জন্য ব্যান্ডউইথের দাম কমানো হলো। যদিও কিছুদিন ধরে শোনা যাচ্ছিল, দেশে ইন্টারনেটের দাম কমছে। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার সম্প্রতি আশ্বাস দিয়েছিলেন— ইন্টারনেটের দাম কমানোর জন্য উদ্যোগ নেবেন তিনি। মূল্য বেঁধে দেবেন ইন্টারনেটের। কিন্তু ইন্টারনেটের নয়, সরাসরি দাম কমানো হলো ব্যান্ডউইথের।


দেশে সরকারিভাবে ব্যান্ডউইথ সরবরাহ করে সাবমেরিন ক্যাবল কোম্পানি লিমিটেড (বিএসসিসিএল)। প্রতিষ্ঠানটি আগের ব্যান্ডউইথে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ দাম কমিয়েছে। ইতোমধ্যে নতুন দাম কার্যকরও হয়েছে।

বিএসসিসিএল-এর নতুন দাম পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ঢাকায় প্রতি মেগা (মেগাবাইট পার সেকেন্ড) ব্যান্ডউইথ কিনতে খরচ পড়বে ৪২৫ থেকে ৪৩৫ টাকা। এই দামে কিনতে হলে ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়েকে (আইআইজিগুলো) বিএসসিসিএল থেকে ন্যূনতম ৩০ জিবি ব্যান্ডউইথ নিতে হবে। ঢাকায় এর দাম পড়বে ৬১০ টাকা।

অন্যদিকে কক্সবাজারে প্রতি মেগা ব্যান্ডউইথের দাম হবে কমপক্ষে ৩১০ টাকা। এই দামে পেতে হলে আইআইজিগুলোকে অন্তত ৫০ জিবি ব্যান্ডউইথ কিনতে হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যান্ডউইথের দাম কমানো হলেও ব্যবহারকারী পর্যায়ে ইন্টারনেটের দাম কমবে না। এমনকি ব্যান্ডউইথের মূল্য একেবারে শূন্য করা হলেও ইন্টারনেটের দামে এর কোনও প্রভাব পড়বে না। আবার একটি পক্ষ বলছে, ভারতে রফতানি করা ব্যান্ডউইথের দামের মধ্যে ভারসাম্য আনতেই দেশীয় বাজারে মূল্য কমানো হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ইন্টারনেট সেবাদাতাদের সংগঠন আইএসপিএবি’র সাধারণ সম্পাদক ইমদাদুল হক  বলেন, ‘এই দাম কমানোতে ব্যবহারকারী পর্যায়ের গ্রাহকদের কোনও লাভ হয়নি। যা লাভ হয়েছে তা ব্যবসায়ীদের।’

দুই এনটিটিএন অপারেটরকে (ব্যান্ডউইথ ট্রান্সমিশন প্রতিষ্ঠান) ইঙ্গিত করে আইএসপিএবি’র সাধারণ সম্পাদক বলেছেন, ‘প্রতিষ্ঠান দুটি মোট সরবরাহকৃত ব্যান্ডউইথের ৫০ শতাংশের বেশি বিএসসিসিএল-এর কাছ থেকে কিনে থাকে। ফলে যে ভলিউমে ব্যান্ডউইথ বিক্রি করার কথা বলা হয়েছে তা কোনও সাধারণ মানুষের পক্ষে কেনা সম্ভব নয়।’

ইমদাদুল হক উল্লেখ করেন, আইএসপি প্রতিষ্ঠানগুলোও এই দাম কমানোর কোনও সুফল পাবে না। কারণ আইএসপিগুলোতে আইআইজির কাছ থেকে ব্যান্ডউইথ কিনতে হয়। তার ভাষ্য, ‘ট্রান্সমিশন কস্ট (ব্যান্ডউইথের পরিবহন খরচ) না কমিয়ে কেবল ব্যান্ডউইথের দাম কমালে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা কখনোই কম দামে ইন্টারনেট পাবে না।’

আইএসপিএবি’র সাধারণ সম্পাদক জানান, আইএসপিগুলোর মোট খরচের মাত্র ৫ থেকে ৮ শতাংশ টাকা ব্যান্ডউইথ কিনতে খরচ হয়। অবশিষ্ট খরচ হয় ট্রান্সমিশন খরচ, অফিস ভাড়া, কর্মচারীদের বেতন, ক্যাবল লাইন তৈরি ইত্যাদিতে। ফলে ব্যান্ডউইথের দাম কমালেও তা গ্রাহক পর্যায়ের দামে কোনও প্রভাব পড়বে না।

জানা যায়, ২০০৪ সালের এক মেগা ব্যান্ডউইথ ৭২ হাজার টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে এর মূল্য ৬০০ টাকারও নিচে। গত ১৪ বছরে প্রতি মেগা ব্যান্ডউইথে ৭১ হাজার ৪০০ টাকা দাম কমলেও ব্যবহারকারী পর্যায়ে সেই অনুপাতে ইন্টারনেটের দাম কত টাকা কমেছে সেই প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর দাবি, ইন্টারনেটের দাম সেই অর্থে খুব একটা না কমলেও গতি বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে কয়েক গুণ।

গত ৪ জানুয়ারি তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার আইসিটি বিভাগের একটি অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, ‘মোবাইল ফোনের ভয়েস কলের মূল্যসীমা বেঁধে দেওয়া হলেও ইন্টারনেটের ক্ষেত্রে এ ধরনের কোনও সীমা নেই। ফলে যে যার ইচ্ছেমতো দামে ইন্টারনেট বিক্রি করছে। আমি ইন্টারনেটের মূল্যসীমা (উচ্চসীমা ও নিম্নসীমা) বেঁধে দেওয়ার জন্য উদ্যোগ নেবো।’

মোস্তাফা জব্বার আরও বলেছিলেন, ‘ইন্টারনেটের ব্যান্ডউইথ কিনে ডাটা বিক্রি করা যাবে না। গ্রাহক যদি ব্যান্ডউইথ কিনতে চায়, তাহলে তাদের জন্য সেই সুযোগ থাকতে হবে। ইন্টারনেট মৌলিক অধিকারগুলোর একটি। এই অধিকার যেন মানুষের কাছে থাকে, আমি সেই চেষ্টা করবো।

কিন্তু মন্ত্রীর এসব কথার পরও ইন্টারনেটের দাম না কমে ব্যান্ডউইথের মূল্য কমলো।

বর্তমানে দেশে ব্যবহার হচ্ছে ৫৫৭ জিবিপিএসর মতো ব্যান্ডউইথ। এর মধ্যে সাবমেরিন ক্যাবল কক্সবাজারের মাধ্যমে আসছে ২৩২, সেকেন্ড সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে ১২০ ও অবশিষ্ট ২০৫ জিবিপিএস আসছে ভারত থেকে ৬ আইটিসির (ইন্টারন্যাশনাল টেরিস্ট্রিয়াল ক্যাবল) মাধ্যমে।

ব্যবহারকারী পর্যায়ে ইন্টারনেট গ্রাহকদের কোনও সুখবর না দিয়ে ফের ব্যবসায়ী গ্রাহকদের জন্য ব্যান্ডউইথের দাম কমানো হলো। যদিও কিছুদিন ধরে শোনা যাচ্ছিল, দেশে ইন্টারনেটের দাম কমছে। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার সম্প্রতি আশ্বাস দিয়েছিলেন— ইন্টারনেটের দাম কমানোর জন্য উদ্যোগ নেবেন তিনি। মূল্য বেঁধে দেবেন ইন্টারনেটের। কিন্তু ইন্টারনেটের নয়, সরাসরি দাম কমানো হলো ব্যান্ডউইথের।