নিঃশ্বাস নেওয়া স্বাস্থ্যের জন্য 'ক্ষতিকর’ যে শহরে

 

ইউরোপের কসোভোর রাজধানীবাসীরা দাবি করছেন, এই শহর এতটাই দূষিত যে ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়েছে ঘরে ঘরে।


১১ ফেব্রুয়ারি, রবিবার এই খবর জানায় বার্তা সংস্থা এএফপি।

কসোভোর রাজধানী প্রিস্টিনা থেকে কিছুটা দূর অবস্থিত অবলিক শহরটি। এই শহরের মূল চালিকাশক্তি হলো দুইটি কয়লা-চালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র।

‘এই শহর নতুন একটা চেরনোবিল হয়ে উঠবে। আমাদের এখান থেকে চলে যেতে হবে,’ বলেন শহরের বাসিন্দা, শ্রমিক আজিম ইব্রাহিমি (৪৬)। তিনি আরও জানান, তার পরিবারের তিনজন ক্যান্সারে মারা গেছেন এই শহরের দূষণে।

অবলিকের বাসিন্দা, ৬৩ বছর বয়সী রুজদি মিরেনা কয়লা খনির সাথে অবস্থিত একটি গ্রাম দেখিয়ে জানান, এই গ্রামের ৮৫টি পরিবারের প্রতিটিতেই কেউ না কেউ ক্যান্সারে আক্রান্ত। ডাঃ জাশরিও বলেন, গত বছরে এই ছোট শহরটিতেই ৮৮ জন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছেন।

অবলিক শহরে 'কসোভো এ' এবং 'কসোভো বি' নামের দুইটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মাঝে এবং আশেপাশেই বাস করে ৩০ হাজার মানুষ।

১৯৬৫ সাল থেকে ১৯৭৫ সালের মাঝে তৈরি হওয়া এই দুইটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র পুরো দেশের ৯৫ শতাংশ বিদ্যুত সরবরাহ করে। কিন্তু কয়লা পোড়ানোর ধোঁয়ায় শহরটিকে প্রচন্ড দূষিত করে ফেলছে এরা। 

অবিলিক শহরটি কতটা দূষিত তা পরিমাপ করার কোন উপায় নেই। কিন্তু অবলিক থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে রাজধানী প্রিস্টিনায় আমেরিকান দূতাবাস থেকে শহরটির দূষণের মাত্রা পরিমাপ করা হয়। দেখা যায়, বিশ্বের সবচাইতে বেশী দূষিত শহরগুলোর মতোই দূষিত অবলিকের বায়ু। 


শহরটি এতই দূষিত যে কোন তথ্য ছাড়াই এর বাসিন্দারা বলে দিতে পারে শহরটি বসবাসের অনুপযুক্ত। ঘন ধোঁয়াশায় ছাওয়া এই শহর, সেখানে মুখে মাস্ক বা মাফলার না জড়িয়ে বের হতে পারেন না তারা।

বায়ুদূষণ নিয়ে সাম্প্রতিক এক বিক্ষোভে প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, ‘নিঃশ্বাস নেওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।’

২০১৩ সালে বিশ্ব ব্যাঙ্কের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতি বছর দূষণের কারণে কসোভো এবং তার অধিবাসীদের ২২৩ মিলিয়ন ইউরো মূল্যমানের ক্ষতি হচ্ছে।

শুধু তাই নয়, বছরে ৮৫২ অকাল মৃত্যু, ৩১৮ জনের ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিস, ৬০৫ জন হাসপাতালে ভর্তি হওয়া এবং ১১,৯০০ বার হাসপাতালের জরুরী বিভাগে ভর্তি হবার পেছনেও কারণ এই বায়ু দূষণ।

ফেব্রুয়ারির ১৭ তারিখে কসোভোর স্বাধীনতার ১০ বছর পূর্তি হবে। সার্বিয়া থেকে মুক্তি পেলেও বায়ু দূষণের হাত থেকে এখনো মুক্তি পায়নি বলকান এই দেশটি। ইউরোপের সবচাইতে দরিদ্র একটি দেশ রয়ে গেছে কসোভো।

কিন্তু কয়লা না পুড়িয়ে উপায়ও নেই তাদের। এদেশের মিনিস্টার অফ ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট, ভালদরিন লুকা এএফপিকে জানান, বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্য কোন উপায়, গ্যাস বা নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট নেই এদেশে। তাদের শুধুই কয়লা আছে।

অবিলিকের এক ছোট হাসপাতালের ডাক্তার হাকি জাশারি মন্তব্য করেন, বিদ্যুৎ দরকারি হলেও এর জন্য মানুষের স্বাস্থ্য এবং পরিবেশের ক্ষতি করা উচিৎ নয়।

কসোভোর ন্যাশনাল ইলেকট্রিসিটি কোম্পানি কেইকের মালিকানায় আছে অবিলিক শহরের ৭২ শতাংশ জমি। অবিলিকের কয়লা খনি এবং বিদ্যুৎ কেন্দ্র দুটোই তারা পরিচালনা করে এবং এগুলোতে ৪,৭০০ মানুষ কাজ করে।

অবিলিকের স্থানীয় টেকনিকাল স্কুলের প্রধান সাহিত জেকিরি বলেন,’আমাদের নিঃশ্বাস নেবার বায়ু, চাষের জমি, পানের পানি সবটাই দূষিত।‘

তিনি আরও জানান, প্রতি শীতে কমপক্ষে ৫-১০ জন শিক্ষার্থী ফুসফুসের সমস্যায় ভুগে অনুপস্থিত থাকে। খোলা বাতাসে খেলাধুলা করার কথা তো ভাবাই যায় না। আর এ বছর বৃষ্টি বা তুষারপার না হওয়াতে বাতাসে দূষণের পরিমাণ আরও বেশী দেখা যাচ্ছে।

‘কসোভো এ’ বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি সোভিয়েত আমলে তৈরি। ‘কসোভো বি’ জার্মান প্রযুক্তিতে তৈরি এবং তুলনামূলকভাবে আধুনিক। 

গত বছর ডিসেম্বরে কসোভো আমেরিকার সাথে এক চুক্তিতে স্বাক্ষর করে যাতে ‘কসোভো এ’ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জায়গায় ১.৩ বিলিয়ন ইউরো মুল্যমানের একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। এতে ধুলোর পরিমাণ কমে যাবে ২৫ শতাংশ এবং চারগুণ কমে যাবে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ। এছাড়া ‘কসোভো বি’ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দূষণ কমানোর জন্য ফিল্টার ব্যবহার করা হবে বলে জানান ভালদরিন লুকা।

এছাড়াও ২০১৬ সালে পাস হওয়া এক আইনে বলা হয়, কেইকে পরিচালিত খনির কয়লা থেকে পাওয়া ২০ শতাংশ অর্থ দিতে হবে অবিলিক শহরকে। এতে শহরের বায়ু দূষণের মাত্রা পরিমাপ করা যাবে, মাটি দূষণমুক্ত করা যাবে এবং চিকিৎসার মান উন্নত করা যাবে, জানান অবলিকের মেয়র জাফর গাশি।

ইউরোপের কসোভোর রাজধানীবাসীরা দাবি করছেন, এই শহর এতটাই দূষিত যে ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়েছে ঘরে ঘরে।